Logo

আন্তর্জাতিক

তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি সাময়িকভাবে ‘স্থগিত’ করল যুক্তরাষ্ট্র

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ২১:১২

তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি সাময়িকভাবে ‘স্থগিত’ করল যুক্তরাষ্ট্র

ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি সাময়িকভাবে 'স্থগিত' করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওয়াশিংটনের ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী প্রধান (অ্যাক্টিং নেভি সেক্রেটারি) হাং কাও। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর নিজস্ব গোলাবারুদের মজুত পর্যাপ্ত রাখার স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানিতে তিনি উল্লেখ করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যের পর এমনিতেই ওয়াশিংটন-তাইপেই কূটনৈতিক সম্পর্কে এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছিল; এর মধ্যে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার এই বক্তব্য তাইওয়ানের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানিতে অংশ নেন ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী প্রধান হাং কাও। সেখানে কয়েক মাস ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১০.৪ বিলিয়ন পাউন্ড) একটি বিশাল সামরিক অস্ত্র সহায়তার প্যাকেজ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এর জবাবে হাং কাও বলেন, এই মুহূর্তে আমরা অস্ত্র বিক্রিতে কিছুটা বিরতি দিচ্ছি। এর উদ্দেশ্য হলো 'এপিক ফিউরি' (ইরান যুদ্ধ)-র জন্য আমাদের নিজেদের প্রয়োজনীয় গোলাবারুদের মজুত নিশ্চিত করা। অবশ্য আমাদের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ রয়েছে। আমরা কেবল নিশ্চিত করছি যেন আমাদের সবকিছু ঠিকঠাক থাকে। এরপর বর্তমান প্রশাসন যখনই প্রয়োজন মনে করবে, তখনই এই বৈদেশিক সামরিক অস্ত্র বিক্রি আবার শুরু হবে।

শুনানিতে মার্কিন সিনেটর মিচ ম্যাককনেল যখন জানতে চান যে—তাইওয়ানের এই অস্ত্র প্যাকেজ শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত হবে কিনা, তখন কাও জানান যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। হাং কাও-এর এই মন্তব্যের পর সিনেটর ম্যাককনেল হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "হ্যাঁ, এটিই আসলে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।"

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর আসছিল। যদিও বর্তমানে যুদ্ধটি একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল এই সামরিক অভিযানের কারণে ওয়াশিংটনকে তাদের নিজস্ব অস্ত্র ভাণ্ডার সুরক্ষায় বাড়তি মনোযোগ দিতে হচ্ছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিতেই তাইওয়ানের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে আপাতত অস্ত্র সরবরাহ থেকে বিরত থাকছে পেন্টাগন।

ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী প্রধানের এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তাইওয়ান। শুক্রবার তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মুখপাত্র কারেন কুও এক বিবৃতিতে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র এই অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা কাটছাঁট করতে যাচ্ছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য তাইপেই এখন পর্যন্ত পায়নি।" তবে মার্কিন কর্মকর্তার এই প্রকাশ্য বক্তব্য যে তাইপেইয়ের জন্য একেবারেই সুখকর নয়, তা স্পষ্ট।

এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো যার মাত্র এক সপ্তাহ আগে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সম্মেলনে মিলিত হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই বৈঠকে ওয়াশিংটনের বহ বিলিয়ন ডলারের তাইওয়ান অস্ত্র প্যাকেজের বিষয়টি আলোচনার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল। গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে চীন সবসময়ই নিজেদের একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ মনে করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও তা মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার হুমকি দিয়ে আসছে। বেইজিং বরাবরই তাইওয়ানের কাছে ওয়াশিংটনের অস্ত্র বিক্রির তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময় শি জিনপিং অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, "তাইওয়ান ইস্যুটি যদি সঠিকভাবে সামলানো না হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরাসরি সংঘর্ষ বা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে।"

কয়েক দশক পুরনো 'তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট'  অনুযায়ী, তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করতে আইনিভাবে বাধ্য যুক্তরাষ্ট্র। তবে বেইজিং থেকে ফেরার পর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই অস্ত্র সহায়তা প্যাকেজটিকে চীনের সঙ্গে একটি 'খুব ভালো দরকষাকষির হাতিয়ার' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর মাধ্যমে ট্রাম্প ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের সেই নীতি ভাঙার ইঙ্গিত দিলেন—যেখানে বলা ছিল তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই চীনের সঙ্গে কোনো পরামর্শ বা আপস করবে না। এমনকি বেইজিং থেকে এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানে ফেরার পথে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাইওয়ান নিয়ে 'বিস্তারিত' আলোচনা করেছেন এবং শিগগিরই ঝুলে থাকা অস্ত্র প্যাকেজের বিষয়ে একটি 'চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত' নেবেন।

তবে এর বিপরীত এক নাটকীয় মোড়ও তৈরি করেছেন ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই তিনি তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের সঙ্গে সরাসরি ফোনালাপ করার পরিকল্পনা করছেন। ১৯৭৯ সালে ওয়াশিংটন তাইপেইয়ের বদলে বেইজিংকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে কোনো দায়িত্বরত মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাইওয়ানের নেতার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেননি। ফলে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বেইজিংকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে, একদিকে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং অন্যদিকে ট্রাম্পের 'ব্যবসায়িক সুলভ' কূটনৈতিক চাল—উভয় সংকটে পড়ে তাইওয়ানের নিরাপত্তা এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।

 

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন