Logo

আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির নতুন অধ্যায়

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ২১:৩৫

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির নতুন অধ্যায়

# ইরান-মার্কিন ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত

# সই করেছেন ট্রাম্প-পেজেশকিয়ান

# চুক্তির খসড়া প্রকাশ

# সমঝোতা স্মারক ঐতিহাসিক দলিল: পেজেশকিয়ান

# শক্তিশালী ইরানের পক্ষ থেকে এটি একটি বার্তা: পেজেশকিয়ান

# চুক্তির শর্ত না মানলে ইরানে আবারও হামলা: ট্রাম্প 

# ইরানের অর্থ ফেরত দেবে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

# নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ বড় ছাড় পাচ্ছে ইরান

# বিশ্ব নেতাদের অভিনন্দন

ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ চিরতরে বন্ধ করার কথা বলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল আমেরিকা ও ইসরায়েল। এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য বদলেছে বারবার। প্রায় ৫ সপ্তাহ তীব্র লড়াইয়ের পর ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এর পর সরাসরি বড় কোনো যুদ্ধ না হলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও অবরোধ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বজায় ছিল। সংঘাতের প্রায় ১১০ দিন পর যুদ্ধ বন্ধে স্থায়ী চুক্তির পথে অগ্রসর হতে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। 

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে ট্রাম্প এ সমঝোতা স্মারকে সই করেন। পরে প্রাসাদ ছাড়ার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা সই হয়েছে। আমি ভার্সাইতে মাত্রই এটাতে সই করেছি।’

একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দুজনেরই সমঝোতা স্মারকটিতে সই করেছেন।

এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি দুই মাসের জন্য সম্পূর্ণ টোলমুক্ত করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি আগ্রাসনের মুখে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রতিশ্রুতিও নিশ্চিত করা হয়েছে চুক্তিতে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি চুক্তির শর্ত মানতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তিনি পুনরায় হামলা চালাতে পারেন এবং ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যার নির্দেশও দিতে পারেন। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। 

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তার মতে, এটি শক্তিশালী ইরানের পক্ষ থেকে একটি বার্তা। পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই কেবল শান্তি অর্জন করা সম্ভব।

বৃহস্পতিবার পেজেশকিয়ান তার সরকারি এক্স অ্যাকাউন্টে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক প্রকাশ করেন। লিখেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল এবং একটি শক্তিশালী ইরানের বার্তা। ইরান তার মর্যাদা, স্বাধীনতা, অগ্রগতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা পুরোপুরি অক্ষুণ্ন রেখে বিশ্ব শান্তির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।’

গতকল বুধবার রাতে পেজেশকিয়ান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিজিটাল স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এরপর থেকে চুক্তির আওতায় ইরানকে ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে ট্রাম্পের সমালোচনা করছেন অনেকে।

এর প্রতিক্রিয়ায় সমালোচনাকারীদের ‘বোকা’ বলে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘এই বোকারা মনে করে আমি ইরানের ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোর ছিলাম না। তারা কি দেখছে না যে, শেয়ারবাজার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং তেলের দাম দ্রুত কমছে। তারা হয় ঈর্ষান্বিত, নয়তো খারাপ মানুষ অথবা নির্বোধ।’

১৪ দফা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে লেবাননের সংঘাতও অন্তর্ভুক্ত। সমঝোতা স্মারক হিসেবে পরিচিত ১৪ দফার এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হবে না। পাশাপাশি দেশটির 'পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের' জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে—যদিও এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অর্থ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। 

এই খসড়া চুক্তিতে তেহরানকে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত লঘু করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে, তবে স্থায়ীভাবে তুলে নেওয়া হবে না। যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে প্রস্তুত করা এ সমঝোতা স্মারক পড়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। 

ট্রাম্প প্রশাসন একে 'পারফরম্যান্স-ভিত্তিক', অর্থাৎ শর্তসাপেক্ষ চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইরান যদি তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করে, তবেই কেবল এর সুফল পাবে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রশাসন।

কয়েকদিনের গোপনীয়তা শেষে বুধবার মার্কিন কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের কাছে চুক্তির এই খসড়া পড়ে শোনান। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও প্রায় একই ধরনের একটি টেক্সট প্রকাশ করে। 

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, খসড়া চুক্তিতে ইরান স্পষ্ট সম্মতি দিয়েছে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। চুক্তিতে তেহরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রসঙ্গটিও উঠে এসেছে; শর্ত দেওয়া হয়েছে—অন্তত ইরানের ভেতরেই এই ইউরেনিয়াম লঘু করতে হবে। 

এর বিনিময়ে চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের ওপর থেকে কিছু বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে তা পুরোপুরি বাতিল করা হবে না। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য ও ইরানের খসড়া অনুযায়ী, চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালিতে মাত্র ৬০ দিনের জন্য অবাধ জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে প্রণালিতে টোল আরোপ না করার কোনো নিশ্চয়তা এতে নেই। 

লেবাননের ভূখণ্ডে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পর দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট বিধানও এই দলিলে রাখা হয়েছে। ইসরায়েল লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেও চুক্তির প্রথম পয়েন্টেই জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই লেবাননে সব ধরনের সামরিক অভিযান অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তিতেও ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে রাশ টানতে রাজি হয়েছিল; কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। তবে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে সেই চুক্তি থেকে বের করে নেন। অন্যদিকে ইরান বরাবরই বলে এসেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ বড় ছাড় পাচ্ছে ইরান: সমঝোতা স্মারকের ষষ্ঠ দফায় বলা হয়েছে, ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আমেরিকা ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি 'চূড়ান্ত ও পারস্পরিক সম্মত পরিকল্পনা' প্রস্তুত করবে। চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৬০ দিনের মধ্যে এর রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। এ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের লাইসেন্স, ছাড় ও আইনি অনুমতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই তহবিলে ওয়াশিংটনের কোনো আর্থিক দায়বদ্ধতা থাকছে না।

একজন মার্কিন উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইরান যদি 'ভালো আচরণ করে', তবে যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেত নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত চাইলে ইরানে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করে দিতে পারে।

এছাড়া ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজল্যুশনসহ আমেরিকার নিজস্ব একতরফা সব নিষেধাজ্ঞাও বাতিল হবে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা ঠিক কবে থেকে, কীভাবে উঠবে, তার সময়সীমা নিয়ে অস্পষ্টতা এখনো কাটেনি। ১১তম দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর ইরানের অবরুদ্ধ তহবিলগুলো পুরোপুরি সচল করার দায়িত্ব নেবে আমেরিকা। বুধবার একজন মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর আলোচনা চলাকালীনই কিছু তহবিল ধাপে ধাপে ছাড় করা হবে। এরইমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে, যাতে ইরান সহজে ও অবাধে তেল বিক্রি করতে পারে।

২০২৪ সালে রপ্তানি থেকে ইরানের আয় ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চীন বরাবরই ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। 

৬০ দিনের আলোচনার শুরুতেই তেল বিক্রিতে ছাড় দিয়ে দরকষাকষির একটি বড় হাতিয়ার হাতছাড়া করেছে ওয়াশিংটন। ২০১৫ সালে মূল চুক্তির একদম শেষ পর্যায়ে গিয়ে ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। দেশ পুনর্গঠনের জন্য ইরানকে যে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল দেওয়া হবে, তা তেহরানের জন্য বড় ভূরাজনৈতিক জয়।

ইরানের অর্থ ফেরত দেবে যুক্তরাষ্ট্র- ট্রাম্প: ইরানের জব্দ করা অর্থ যুক্তরাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ভাষ্য, ওই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বরং ইরানের। তার মতে, ইরানের অর্থ ফেরত না দিলে ডলারে কেউ বিনিয়োগ করবে না। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ইরান চুক্তির শর্ত মেনে চললে দেশটির পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পথও খুলে যেতে পারে।

বুধবার (১৭ জুন) জি-৭ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ জব্দ করে রেখেছে এবং তা শেষ পর্যন্ত ফেরত দিতে হবে। আমরা তাদের অনেক অর্থ নিয়েছি এবং সেই অর্থ আমাদের কাছে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের অর্থ নয়, এটা তাদের অর্থ। আমরা একসময় এটি জব্দ করেছিলাম। আমার মনে হয়, আমাদের তা ফেরত দিতেই হবে। কারণ যদি আমরা তা ফেরত না দিই, তাহলে কেউ আর কখনোই ডলারে বিনিয়োগ করবে না।’

বিশ্ব নেতাদের অভিনন্দন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় অভিনন্দন জানিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট  ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেন, ‘এই চুক্তি স্থায়ী শান্তির পথ খুলে দেবে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর সুযোগ তৈরি করবে। তার মতে, এতে জ্বালানির দামও কমতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক হবে।’

অন্যদিকে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। দেশটি এই সংঘাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, ‘এই চুক্তি দেখায় যে দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত সমাধানে অঙ্গীকারবদ্ধ।’

তিনি বলেন, ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং অবিলম্বে কার্যকর হবে। প্রথম ধাপে ইরান সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে।’

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তার কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি অটল অবস্থান আবারও এমন একটি সংঘাত শেষ করতে সাহায্য করেছে, যা পুরো অঞ্চল এবং তার বাইরেও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারত। 

গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতা থামছে না: ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলার মধ্যেই ইসরায়েলের হামলায় ফিলিস্তিনের গাজায় এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর ফলে অবরুদ্ধ উপত্যকাটির মানবিক পরিস্থিতি এখনো নাজুক রয়ে গেছে।

হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপরও ইসরায়েলি হামলা থামেনি।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় বিভিন্ন হামলায় এক হাজার পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

যুক্তরাজ্যের দাতব্য প্রতিষ্ঠান মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টানিয়ানসের গাজা–বিষয়ক পরিচালক ফিকর শালতুত বলেন, ‘গাজা আরও একটি মর্মান্তিক মাইলফলকে পৌঁছানোয় আমরা শোকাহত। সেখানকার হাজার হাজার মানুষকে বলা হয়েছিল, সবচেয়ে খারাপ সময়টা কেটে গেছে। কিন্তু তাঁরা এখনো তাঁদের প্রিয়জনদের দাফন করছেন।’

গাজার সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। এর পর থেকে উপত্যকাটিতে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। গাজার বেশির ভাগ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানকার প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

আরও কমল জ্বালানির দাম: যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক শান্তিচুক্তিতে সই করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও কমেছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সতর্ক করেছিলেন, প্রয়োজন হলে তিনি আবারও ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন। তাঁর ওই মন্তব্যে জ্বালানি তেলের দাম কমার যে ধারা সাময়িকভাবে থেমে গিয়েছিল, চুক্তি সইয়ের পর তা আবার শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। গ্রিনিচ মান সময় ভোর সাড়ে চারটায় আগস্টে সরবরাহযোগ্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলার ৭ সেন্ট। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় এটি মাত্র ৭ শতাংশ বেশি।

টানা কয়েক দিন কমার পর গতকাল বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮১ ডলারের ওপরে উঠেছিল। এর কারণ ছিল ট্রাম্পের একটি মন্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ইরান ‘ভালো আচরণ’ না করলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও দেশটিতে বোমা হামলা শুরু করতে পারে। অন্যদিকে প্রায় চার মাস ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় চলমান সংকট কেটে যাওয়ার প্রত্যাশায় এশিয়ার শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা গেছে।

ইরান-মার্কিন ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি ২০২৫ সালের পর থেকে চলমান মার্কিন-ইরান উত্তেজনা প্রশমনের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। এটি শুধু দুই দেশের নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি যৌথ নির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে, যা অগ্রগতি ও অনুগততা পর্যবেক্ষণ করবে। চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

ইরান-মার্কিন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও অবিশ্বাসের অবসান ঘটল। যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ; সব মিলিয়ে এটি একটি ঐতিহাসিক শান্তি উদ্যোগ, যা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন