ইউক্রেনকে ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইল তৈরির লাইসেন্স দিলেন ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ২০:৩৮
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে এমন একটি বড় ঘোষণা এসেছে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে। ইউক্রেনের আকাশে রাশিয়ার লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে কিয়েভকে অত্যাধুনিক মার্কিন ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দেশীয়ভাবে উৎপাদনের লাইসেন্স দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প নিজেই এই তথ্য নিশ্চিত
করেছেন। জেলেনস্কিকে উদ্দেশ্য করে ট্রাম্প বলেন, একটি গোপন সূত্র আমাকে এটি নিশ্চিত
করেছে যে, আমরা আপনাদের প্যাট্রিয়ট তৈরির অধিকার দেব। এটি কীভাবে তৈরি করতে হয় আমরা
তা দেখিয়ে দেব।
প্রযুক্তিটি বেশ জটিল, তবে আপনারা দ্রুতই
এটি আয়ত্ত করতে পারবেন। এর ফলে আপনাদের আর এই অভিযোগ থাকবে না যে আমরা পর্যাপ্ত অস্ত্র
দিচ্ছি না। তবে ওয়াশিংটন তার নিজস্ব মজুত থেকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র দেবে না এবং
ইউক্রেনে এই উৎপাদন ঠিক কবে নাগাদ শুরু হবে, তা ট্রাম্প সুনির্দিষ্টভাবে জানাননি।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে
এই সিদ্ধান্তের সুবিধা ইউক্রেন তাৎক্ষণিকভাবে না-ও পেতে পারে। জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির
গবেষক নিকোলে মিত্রোখিন বলেন, আপাতদৃষ্টিতে কিয়েভ এখনই কিছু পাচ্ছে না। তবে মার্কিন
প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার পাওয়ায় ইউক্রেনের নিজস্ব ব্যালিস্টিক ও কাউন্টার-ব্যালিস্টিক
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অভাবনীয় গতি পাবে। তিনি মনে করেন, ইউক্রেন যদি প্যাট্রিয়টের
সব অংশ তৈরি না করে কেবল এর ক্ষেপণাস্ত্রের সহজ ও সস্তা সংস্করণ তৈরি করতে চায়, তবে
এক বছরেরও কম সময়ে তা সম্ভব।
প্যাট্রিয়ট মূলত একটি জটিল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা,
যার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও রাডার, কন্ট্রোল ভ্যান ও লঞ্চার থাকে। ইউক্রেন আপাতত
এর ক্ষেপণাস্ত্র অংশটি তৈরিতেই বেশি মনোযোগ দেবে।
২০২২ সালে যখন এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তখন
দুই সাবেক সোভিয়েত দেশের লড়াইয়ে ট্যাংক এবং ঐতিহ্যবাহী কামানের ব্যবহার বেশি ছিল। তবে
২০২৬ সালে এসে যুদ্ধের ধরন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’-এর সামরিক বিশ্লেষক
পাভেল লুজিন বলেন, যুদ্ধ এখন ‘নেটওয়ার্ক-সেন্ট্রিক’ বা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে মোড় নিয়েছে।
সেনাসংকট ও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানি এড়াতে
ইউক্রেন এখন ব্যাপকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ড্রোন ও রোবটের ওপর নির্ভর করছে।
গুগল-এর সাবেক প্রধান নির্বাহী এরিক শ্মিটের মালিকানাধীন ‘সুইফট বিট’ কোম্পানির তৈরি ‘হর্নেটস’ নামক ড্রোনগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ব্যবহার করে রুশ জ্বালানি ট্যাংকার ও সামরিক বহর নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে ধ্বংস করছে।
ইলেকট্রনিক জ্যামিং পদ্ধতি ব্যবহার করেও এই ড্রোনগুলোকে থামানো যাচ্ছে না।
ইউক্রেনীয় সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রেমলিন
আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগ করার চেয়ে ব্যয়বহুল দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে
বেশি মনোযোগ দিয়ে ভুল করেছে। রাশিয়ার বিশাল ভৌগোলিক আয়তনের তুলনায় তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা
অত্যন্ত দুর্বল।
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক ডেপুটি
চিফ অফ জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট-জেনারেল ইহোর রোমানেনকো বলেন, তাদের হাতে যে প্রযুক্তি
আছে, তা দিয়ে এই বিশাল এলাকা পাহারা দেওয়া অসম্ভব। সম্প্রতি ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে
সাইবেরিয়ার ওমস্ক শহরে অবস্থিত রাশিয়ার বৃহত্তম তেল শোধনাগারের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
এর পরপরই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ঘোষণা করেছেন, এই যুদ্ধের চূড়ান্ত ফয়সালা হবে আকাশে।
তবে ইউক্রেনের সাবেক শীর্ষ জেনারেল ও বর্তমানে
যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ভ্যালেরি জালুঝনি সতর্ক করে বলেছেন, শুধু
আকাশপথে হামলা চালিয়ে চূড়ান্ত বিজয় সম্ভব নয়। কারণ রাশিয়াও সমান বা তার চেয়ে বেশি শক্তি
নিয়ে পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে। বাস্তবেও তাই ঘটছে; অতি সম্প্রতি কিয়েভে রাশিয়ার
এক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ২৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
কিয়েভের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র
সাফল্য হোয়াইট হাউসকে শান্তি আলোচনার টেবিল নতুন করে সাজাতে উদ্বুদ্ধ করছে। কিয়েভভিত্তিক
থিংক ট্যাংক ‘পেন্টা’-এর প্রধান
ভলোদিমির ফেসেঙ্কো বলেন, ইউক্রেন মার্কিন পক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে শান্তি আলোচনার
যুক্তি পরিবর্তন করা দরকার। এখন ইউক্রেনের পক্ষ থেকে অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার ছাড় নয়, বরং
সরাসরি যুদ্ধবিরতি নিয়ে কথা বলা উচিত।
ক্রেমলিন এখনো প্রস্তুত না হলেও, মার্কিন
প্রশাসন এখন এই যুদ্ধবিরতির পথেই হাঁটতে চাইছে। তবে পুতিন কখন তাঁর অনমনীয় অবস্থান
থেকে সরে আসবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার পর কিয়েভ
কত দ্রুত তা দেশীয়ভাবে উৎপাদন করে রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর
করছে এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

