জনপ্রিয়তার আড়ালে কঠিন বাস্তবতার পরীক্ষায় ইব্রাহিম ট্রাওরে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ২০:৫০
২০২২ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার মসনদে বসেন বুরকিনা ফাসোর ৩৮ বছর বয়সী তরুণ সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরে। পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে তার অবাধ্য অবস্থান, ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার বলিষ্ঠ বার্তা তাকে রাতারাতি সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশে ‘সার্বভৌমত্ব ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের সংকেত’ হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে।
তবে এই গ্লামারাস আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির
পেছনে নিজ দেশে তার সরকারের আসল পারফরম্যান্স এবং অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা এখন এক কঠিন
পরীক্ষার মুখোমুখি। সম্প্রতি দেশের জনগণকে ‘গণতন্ত্র ভুলে যাওয়ার’ আহ্বান জানিয়ে ট্রাওরে
স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, বুরকিনা ফাসো এখন গণতান্ত্রিক পর্বে নেই বরং একটি 'বিপ্লবী
পর্বে'র মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সামরিক শাসনের মেয়াদ বাড়ানোর পর রাজনৈতিক
দলগুলো বিলুপ্ত ঘোষণা করে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর
করা তার সরকারের অগ্রাধিকার নয়।
আফ্রিকার সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের
সৈন্যদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা, রাশিয়ার সাথে সরাসরি সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার
করা এবং স্থানীয় কৃষি ও উৎপাদন খাত বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ—এই তিনটি কারণে ট্রাওরে
সমগ্র আফ্রিকায় ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন। অনেকেই তার মধ্যে বুরকিনা ফাসোর ঐতিহাসিক বিপ্লবী
নেতা টমাস সংকারার প্রতিচ্ছবি দেখতে পান।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে
পশ্চিমা সমর্থিত সামরিক উপস্থিতির পর কোনো সুফল না পেয়ে ক্লান্ত দেশটির সাধারণ মানুষ
ট্রাওরের এই কঠোর ও সার্বভৌমত্বমুখী নীতিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে।
তিনি পশ্চিম আফ্রিকার অর্থনৈতিক জোট ‘ইকোওয়াস’ থেকে দেশকে বের করে এনে প্রতিবেশী
মালি ও নাইজারের সাথে 'অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস' গঠন করেন, যা তাকে সাধারণ আফ্রিকানদের
চোখে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
ট্রাওরে ক্ষমতায় এসেছিলেন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর
তান্ডব ও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিশ্রুতি
দিয়ে। তার সরকার দাবিকৃত অনেক এলাকা পুনরুদ্ধার করা এবং ‘স্বেচ্ছাসেবক প্রতিরক্ষা দল’ বৃদ্ধির তথ্য
প্রচার করলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র যথেষ্ট উদ্বেগজনক। আল-কায়েদা ও আইএস সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র
গোষ্ঠীগুলোর হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সংঘাতের কারণে বুরকিনা ফাসোয় এখন পর্যন্ত
২০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন এবং দেশটির লাখ লাখ নাগরিক
সরাসরি আন্তর্জাতিক ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। মূলধারার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের
অবাধ প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় সরকারি সামরিক বিজয়ের অনেক দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাই
করা সম্ভব হচ্ছে না।
সামরিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার অংশ হিসেবে
দেশে যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক দলগুলো স্থগিত করা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন’ পাসের পর বেশ কিছু
প্রভাবশালী আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা ইতিপূর্বে ট্রাওরের
সমর্থক ছিলেন বলে মনে করা হতো। এতে করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের অধিকার মারাত্মকভাবে
খর্ব হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। ইব্রাহিম ট্রাওরে
তার বলিষ্ঠ বক্তব্য ও জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তির দিয়ে বিশ্বজুড়ে যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে
পেরেছেন, সেটি প্রশংসনীয় হলেও নিজ দেশের নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এর ইতিবাচক
রূপান্তর ঘটাতে পারাটাই এখন তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজধানী উয়াগাদুগুর এক তরুণ সামাজিক রাজনৈতিক
কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সঠিকভাবেই বলেছেন, আমাদের একজন নেতা আছেন যিনি পশ্চিমের
চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন, এতে আমরা গর্বিত। কিন্তু খালি চোখে এই আত্মমর্যাদা পরিবারকে
অন্ন যোগায় না, কিংবা রক্তক্ষয়ী হামলার হাত থেকে গ্রামকে সুরক্ষাও দেয় না। আমরা ট্রাওরেকে
কেবল শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখতে চাই না; আমরা তাকে ঘরের মাঠে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের
প্রতীক হিসেবে দেখতে চাই।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

