Logo

আন্তর্জাতিক

প্রাণহানি বাড়ছেই

নেপালে আকস্মিক বন্যা-ভূমিধসে মৃত্যু বেড়ে ৩৫৯

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ২১:০৪

নেপালে আকস্মিক বন্যা-ভূমিধসে মৃত্যু বেড়ে ৩৫৯

# বিদেশি ৮০০ জনসহ নিখোঁজ ১৫০০

# রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শোক

# সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

# কোনো বাংলাদেশি হতাহত নেই: দূতাবাস

# নিখোঁজদের সন্ধানে চলছে অভিযান

# ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ‘দুর্যোগকবলিত’ ঘোষণা

# হিমবাহ ভেঙে পড়ায় বন্যা-ভূমিধস: রয়টার্স

# হুমকিতে হিমালয় অঞ্চলের জনপদ

# সড়ক-সেতু ক্ষতিগ্রস্ত, হেলিকপ্টারে উদ্ধার

# দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা

# অর্থনৈতিক ক্ষতি বিলিয়ন ডলার

# বালেন্দ্র সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ

হিমবাহ ধসে কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ফলে কাদার স্রোতে নেপাল-চীন সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় মৃত্যুর সংখ্যা হুহু করে বেড়েই চলছে। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত নিহত বেড়ে ৩৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আরও ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি নিখোঁজ রয়েছেন। গতকাল বুধবার হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট প্রবল পানি ও কাদার স্রোত কয়েকটি জনপদে আঘাত হানে। এতে নেপালের পাশাপাশি তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নেপাল সরকার ভোটেকোশি নদীর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় এলাকাগুলোকে তিন মাসের জন্য দুর্যোগকবলিত অঞ্চল ঘোষণা করেছে।

এদিকে, নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকেও নেপালের ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।

এছাড়া বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এবং নেপালের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক সমবেদনা জানান। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নেপালে ভয়াবহ বন্যায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনায় আমি গভীরভাবে শোকাহত ও ব্যথিত। আমাদের চিন্তা ও প্রার্থনা প্রিয়জন হারানো সেসব পরিবার ও মানুষের সাথে রয়েছে, যাঁদের এই অপূরণীয় ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে।’

এই কঠিন বিপর্যয়ে বাংলাদেশ নেপালের পাশে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দুর্যোগের এই সংকটময় মুহূর্তে নেপালকে যেকোনো প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে বাংলাদেশ সরকার প্রস্তুত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বন্যায় নিহত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।

সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ: নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, একই সঙ্গে সেখানে অবস্থানরত কোনো বাংলাদেশি নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের পাশে দাঁড়াতেও প্রস্তুত রয়েছে।

গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ড. খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা তাদের সব ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছি।

এদিন সকালে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে জানিয়েছেন যে, তারা এখনও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন তা মূল্যায়ন করছেন। তিনি বলেছেন, আজ সন্ধ্যা বা আগামীকালের মধ্যে তারা আমাদের জানাবেন কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, নেপাল তাদের নির্দিষ্ট প্রয়োজনের কথা জানানোর পর বাংলাদেশ সাড়া দিতে প্রস্তুত রয়েছে। ফোনালাপে খলিলুর রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে গভীর সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রকাশ করেন।

এদিকে, নেপাল পুলিশের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে জানিয়েছেন, গতকাল পর্যন্ত বন্যায় ৩৬০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া আরও অন্তত ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সেই সঙ্গে তিব্বতে আরও তিনজন নিহত হয়েছেন এবং সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৫৫৮ জন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চিতওয়ানে ১২১, নওয়ালপরাসি পূর্বে ৭৪, ধাদিঙে ২৯, গোর্খায় ২৯, নুয়াকোটে ২৮, তানাহুনে ১৯, রাসুয়ায় ১৭ এবং নওয়ালপরাসি পশ্চিমে ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

ড্রোনের মাধ্যমে ধারণ করা ভিডিওতে নেপালের ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতা উঠে আসে। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, প্রাণ বাঁচাতে পালানোর সময় বন্যার পানির স্রোতে মানুষ ভেসে যাচ্ছে এবং ভবন ও সেতু ধসে পড়ছে।

নুয়াকোট জেলার সোলি গ্রামের প্রায় ২৫টি বাড়ি নিয়ে গঠিত জনপদটি প্রায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কাঠমান্ডুভিত্তিক সাংবাদিক নিরাজন পৌডিয়াল। তার বাবা-মা ও স্বজনরা ওই গ্রামে থাকেন। পরিবারের খোঁজ নিতে আজ বৃহস্পতিবার তিনি সেখানে গেছেন। পৌডিয়াল বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তাদের কোনো খবর নেই। আশঙ্কা করছি, আর কোনো খবর পাওয়া যাবে না।’

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ‘দুর্যোগকবলিত’ ঘোষণা: নেপাল সরকার ভোটেকোশি নদীর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় এলাকাগুলোকে তিন মাসের জন্য দুর্যোগকবলিত অঞ্চল ঘোষণা করেছে। এ ঘোষণার মাধ্যমে দুর্গতদের উদ্ধার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, জানিয়েছে হিমালয়ান টাইমস।

নেপালি গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, বুধবার রাজধানী কাঠমান্ডুর সিংহ দরবারে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে বন্যায় নিহতদের প্রতি শোক ও তাদের পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানানো হয়।

নেপাল সরকারের মুখপাত্র এবং শিক্ষা ও ক্রীড়ামন্ত্রী সস্মিত পোখরেল জানান, আহতদের বিনা খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আহতদের ও ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে অবিলম্বে উদ্ধার করার এবং ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার অভিযানের জন্য মন্ত্রণালয়টিকে নেপালের সেনাবাহিনী, বেসরকারি হেলিকপ্টার ও অন্যান্য সম্পদ কাজে লাগানোরও কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় দুর্যোগ কমিটিগুলোকে বন্যাদুর্গতদের জন্য খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশটির পূর্ত মন্ত্রণালয়কে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামত ও দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলোতে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বন্যায় আপনজন হারানো পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেবে সরকার। আর অর্থমন্ত্রীকে ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি ও ভৌত অবকাঠামো পুনর্র্নিমাণের জন্য আর্থিক বরাদ্দ সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিখোঁজদের সন্ধানে চলছে অভিযান: গত বুধবারের বিধ্বংসী বন্যার পর গতকাল বিকেল পর্যন্ত দেশটির আটটি জেলা থেকে এসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজদের সন্ধানে পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে। কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালি পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত মৃতের সংশোধিত সংখ্যা ৩৫৯ জনে পৌঁছানোর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে চিতওয়ান ও নওয়ালপরাসি পূর্ব জেলায়। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং বন্যার পানিতে আটকে পড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কাজ চলছে।

পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের সঙ্গে সমন্বয় করে নদীর তীরবর্তী এলাকা, ধ্বংসস্তূপ এবং দুর্গম স্থানে তল্লাশি চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসাবশেষে অবরুদ্ধ সড়কগুলোও পরিষ্কার করার কাজ চলছে।

কোনো বাংলাদেশি হতাহত নেই: নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি নাগরিক নিহত বা আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। গতকাল নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাস এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। দূতাবাস জানায়, নেপালের আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ দূতাবাস। এখন পর্যন্ত বন্যা ও ভূমিধসে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে গত বুধবার সাময়িকভাবে কাঠমাণ্ডু-পোখারা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিক সেখানে আটকা পড়েছিলেন। পরে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হলে তারা নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছান বলে জানিয়েছে দূতাবাস।

দূতাবাস আরও জানিয়েছে, নেপাল সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত যেকোনো সাহায্য-সহযোগিতা পৌঁছে দেওয়া এবং এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় মতবিনিময় ও কার্যক্রম সমন্বয়ের কাজও করা হচ্ছে। নেপালের বন্যা ও ভূমিধস পরিস্থিতির ওপর দূতাবাসের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

হিমবাহ ভেঙে পড়ায় বন্যা-ভূমিধস: প্ল্যানেট ল্যাবস-এর স্যাটেলাইট চিত্র উদ্ধৃত করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হিমবাহ ভেঙে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার কারণে নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির সহযোগী অধ্যাপক এবং ভূ-বিজ্ঞানী ড্যান শুগার জানিয়েছেন, ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার ফলে নেপালের আকস্মিক বন্যা হয়ে থাকতে পারে। 

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, চিত্রগুলো দেখে মনে হচ্ছে বিপর্যয়ের আগের ২৪ ঘণ্টায় বিপুল পরিমাণ বরফ গলে গিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘উপত্যকার কিছু হিমবাহ গতকাল বরফে ঢাকা ছিল এবং আজ সেগুলোতে বেশিরভাগই শুধু খালি বরফ (বেয়ার আইস) দেখা যাচ্ছে। অন্যভাবে বলতে গেলে সম্ভবত তখন আবহাওয়া উষ্ণ ছিল। যদিও আমি এখনও কোনো আবহাওয়া স্টেশনের ডেটা দেখিনি।’ 

২০২৩ সালে জাতিসংঘ জানিয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মাত্র ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে নেপালের তুষারাবৃত পর্বতগুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। সংস্থাটি ওই বছর আরও যোগ করে, বিশ্বের প্রধান দুই কার্বন নির্গমনকারী দেশ— ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপালের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় গত দশকে ৬৫ শতাংশ দ্রুত গলেছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নে হুমকিতে হিমালয় অঞ্চলের জনপদ: ভারত, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশজুড়ে বিস্তৃত হিমালয় পর্বতমালায় বিশ্বের অনেক উঁচু শৃঙ্গ ও হিমবাহ রয়েছে। পর্বতমালার খাড়া ঢাল ও নিচের সবুজ উপত্যকাগুলো বন্যা, ভূমিধস ও চরম আবহাওয়ার জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ায় হিমবাহ গলে যাওয়ার ঘটনাও বেড়েছে। কাঠমান্ডুর গবেষকেরা চলতি বছরের শুরুতে দেখতে পান, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্রুত গলছে এবং ২০০০ সালের পর থেকে বরফ গলার হার দ্বিগুণ হয়েছে।

সড়ক-সেতু ক্ষতিগ্রস্ত, হেলিকপ্টারে উদ্ধার: নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যায় কয়েক ডজন সেতু ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপালি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত বলেন, গতকাল সকালে হেলিকপ্টারে বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি জানান, অন্তত আটজন বিদেশি নাগরিককে হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ত্রিশুলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় আটকে পড়া লোকজনকেও সেনাবাহিনীর দল উদ্ধার করেছে।

উদ্ধারকারীরা দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ান জেলায়ও মরদেহ উদ্ধার করেছেন। গুরুতর আহত বেশ কয়েকজন মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে।

চীনা কর্তৃপক্ষ একটি বড় সামরিক পরিবহন বিমানের মাধ্যমে ওই এলাকায় উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংও বৃহস্পতিবার গিরংয়ে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনা করছেন।

এদিকে, সোচিয়াল নদী ও পুরুপছিয়াংজাংবু নদীর সংযোগস্থলে সৃষ্ট একটি বাঁধ দেওয়া হ্রদ উপচে পড়ছে এবং সেটিও ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

শত শত বিদেশি পর্যটন নিখোঁজ: পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেপালে নিখোঁজ ১৫০০ জনের মধ্যে প্রায় ৬০০ জনই বিদেশি নাগরিক। দুই ডজনেরও বেশি দেশের নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ১৭৭ জন ভারতের, ৬৩ জন যুক্তরাষ্ট্রের, ৩৪ জন অস্ট্রেলিয়ার, ৩৩ জন ব্রিটেনের এবং ২৫ জন কানাডার নাগরিক।

গতকাল চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের জিরোং কাউন্টিতে নিখোঁজের সংখ্যা ৫৫৮ জন, যার মধ্যে ২৬০ জন বিদেশী নাগরিক রয়েছেন।

যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, পানির প্রবল তোড় এবং কাদা-পাথরের ধ্বংসাবশেষ জিরোং-এর একটি সীমান্ত ক্রসিংয়ে ডজন ডজন মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর নিম্নপ্রবাহে নেপালের ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ভেসে গেছে। 

দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা: বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গতকাল অথবা আজ ওই এলাকায় ‘দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ’ আঘাত হানতে পারে। রাতভর নারায়ণী নদীতে ২০০ কিলোমিটার দূরে নওয়ালপরাসি জেলায় মানবদেহ, পশুর মরদেহ ও ধ্বংসস্তূপ ভাসতে দেখা গেছে। নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারী বিবিসিকে জানিয়েছেন, আজ বা আগামীকাল দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানতে পারে। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। চীনে থাকা সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। সেখানে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে না, তবে নতুন করে ভূমিধস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

অধিকারী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখানে বাস্তবেই ঘটছে। ‘আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, কিন্তু জানতাম না যে নির্দিষ্ট কোনো দিনে এমন ঘটনা ঘটবে।’

অর্থনৈতিক ক্ষতি বিলিয়ন ডলার: এই দুর্যোগ নেপালের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি (লস অ্যান্ড ড্যামেজ) বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে ভোতে কোসি ও ত্রিশূলীর উপর কমপক্ষে ৬টি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ট্রান্সমিশন লাইন ও বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নুয়াকোটের ২৫ মেগাওয়াট সোলার প্ল্যান্ট কাদায় চাপা পড়েছে। কমপক্ষে এক ডজন সেতু ভেসে গেছে, যা উত্তরের মহাসড়ক বিচ্ছিন্ন করেছে।

নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ: গত বছর সেপ্টেম্বরের আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহের দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। তার সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র ৬ মাস। এখন এই সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘমেয়াদে ভূমিকম্প ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে কার্যকর কৌশল তৈরি করতে হবে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টেও তিব্বতে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে একটি হিমবাহ ধসে হ্রদ উপচে পড়ায় একই ধরনের আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। ওই ঘটনায় নয়জন নিহত হন এবং নেপাল-চীনকে সংযুক্ত করা একটি সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন