Logo

আন্তর্জাতিক

‎দিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শুরু আজ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৭

‎দিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শুরু আজ

‎# পুতিন-পেজেশকিয়ানের সঙ্গে মোদির বৈঠক
‎# সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সংকট, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে
‎# নয়াদিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তা

‎উন্নয়নশীল অর্থনীতির জোট ব্রিকসের বহুল প্রতীক্ষিত ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন আজ শনিবার আয়োজক দেশ ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। এতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা অংশ নিচ্ছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার এবারের সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
‎সম্মেলনকে কেন্দ্র করে রাজধানী নয়াদিল্লিতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিশ্বনেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নয়াদিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও ভিভিআইপি রুটগুলোতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্থাপন করেছে উচ্চপ্রযুক্তির একটি ডেডিকেটেড কন্ট্রোল রুম। সেখান থেকে সার্বক্ষণিকভাবে বিশ্বনেতাদের মোটরকেডের গতিবিধি এবং রাজধানীর সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
‎সম্মেলনে যোগ দিতে গতকাল শুক্রবার রাতেই নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও ব্রিকস সম্মেলন এ যোগ দিতে গতকাল নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন।
‎এছাড়া সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং,দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতা শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের পরিবর্তে দেশটির প্রতিনিধিত্ব করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েইরা।
‎পুতিন-পেজেশকিয়ানের সঙ্গে মোদির বৈঠক: নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আবহে গতকালই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এনডিটিভি লিখেছে, আজ শনিবার শুরু হতে চলা ১১ সদস্যের এই উদীয়মান অর্থনৈতিক জোটের বৈঠকে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়া ও ইউক্রেইন যুদ্ধ নিয়ে জোটের অভ্যন্তরীন মতপার্থক্য এবং বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও নেতারা আলোচনা হওয়ার কথা।
‎বৈঠকে ব্রহ্মোসের উন্নত সংস্করণ, এস-৪০০ এর বাকি ইউনিট এবং রাশিয়ার সু-৫৭ যুদ্ধবিমান নিয়ে আলোচনা হতে পারে।রুশ তেল সরবরাহের পাশাপাশি ভারতে নতুন অসামরিক পরমাণু চুল্লি তৈরিতে রাশিয়ার সহযোগিতা নিয়েও কথা হতে পারে।
‎২০২২ সালে ইউক্রেইনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পরে প্রথম বার রাশিয়ার বাইরে কোনও দেশে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিলেন পুতিন। এদিন তাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং।
‎অংশীদার ও আউটরিচ দেশ: বর্তমানে ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য দেশগুলো হলো ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। অংশীদার ও আউটরিচ দেশগুলোর অধিবেশনে অংশ নেবেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ত তোকায়েভ, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চানভিরাকুল, কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল, নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ তিনুবু, উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভ এবং উগান্ডার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেসিকা আলুপো।
‎জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সম্মেলন-সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
‎বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে ১১ সেপ্টেম্বর ব্রিকস বিজনেস ফোরামে ভাষণ দেবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখবেন বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ফোরামে কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, জ্বালানি, খাদ্যনিরাপত্তা ও সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে আলোচনা হবে।
‎ব্যবসায়িক ফোরামের প্রতিনিধিদলে আছেন চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (সিএনপিসি) চেয়ারম্যান দাই হাউলিয়াং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়নার (আইসিবিসি) চেয়ারম্যান লিন লিয়াও, চায়না কসকো শিপিংয়ের চেয়ারম্যান ওয়ান মিন এবং হুয়াওয়ে ও আলিবাবার শীর্ষ নির্বাহীরা। এ ছাড়া এমব্রায়ার, ভালে, নাসপার্স, রাশিয়ান রেলওয়েজ ও সবারব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরাও অংশ নেবেন।
‎অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে গুরুত্ব: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে এবারের ব্রিকস সম্মেলনকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও এবারের শীর্ষ বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্যসূচি হয়ে উঠতে পারে।
‎বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্রিকসের প্রভাব বাড়ার প্রেক্ষাপটে এবারের সম্মেলনের দিকে তাই বিশেষ নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের।
‎এর আগে বিশকেকে এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে মোদির সঙ্গে দেখা করেছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। গতকালের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে সেই আলোচনা আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন তিনি। পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেন যে, ভারত ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে এবং দুই দেশ তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বাড়াতে পারে।
‎ওদিকে, ২০২০ সালের লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘর্ষের পর এবার প্রথম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার প্রেক্ষাপটে দুদিনের এই সম্মেলনের ফাঁকে মোদীর সঙ্গে তারও বৈঠকের কথা রয়েছে। সম্প্রতি দুই প্রতিবেশী পরাশক্তির মধ্যে ফ্লাইট, ভিসা ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় চালু হয়েছে।
‎২০০৯ সালে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক সংস্থাগুলোতে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে উদীয়মান অর্থনীতির ফোরাম হিসেবে গঠিত হয়েছিল ‘ব্রিকস’। পরবর্তীতে জোটটির সম্প্রসারণ ঘটে এবং এতে যুক্ত হয় ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুরু করা পশ্চিম এশিয়া যুদ্ধ নিয়ে এই তিন সদস্য দেশের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে।
‎২০২৬ সালের ব্রিকস সভাপতি হিসেবে ভারত সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর পাশাপাশি অতিথি রাষ্ট্রগুলোর প্রধানদেরও এই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। বর্ধিত ব্রিকস জোটের বর্তমান সদস্য দেশগুলো হলো, ব্রাজিল, চীন, মিসর, ইথিওপিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
‎ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর নেতারা সাধারণ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সহযোগিতা জোরদার এবং পারস্পরিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে মতামত বিনিময় করবেন।
‎সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দুদিনের এই সম্মেলনে বৈশ্বিক কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে ইতিবাচক ও অর্থবহ আলোচনা হবে।
‎একটি সংস্কৃত শ্লোক উদ্ধৃত করে তিনি লেখেন, ‘সজ্জনদের সঙ্গেই কেবল বার্তালাপ ও একসঙ্গে কাজ করা উচিত, বিতর্ক কিংবা বন্ধুত্ব, সবই গুণীজনদের সঙ্গে হওয়া বাঞ্ছনীয়, অসজ্জনদের সঙ্গে নয়।’
‎এই সম্মেলনে পুতিন, শি ও পেজেশকিয়ান ছাড়াও আরও নয়টি দেশের শীর্ষনেতা ও একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানেরা অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাপোসা, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেনকো, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল।
‎ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের পরিবর্তে যোগ দিচ্ছেন আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। এছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সম্মেলনে অংশ নিতে পারেন বলে সম্ভাবনা রয়েছে।
‎এদিকে, দিল্লির ভারত মণ্ডপমে ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজধানীজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার দিল্লি পুলিশ সদস্য ও ২০০ কোম্পানি আধা-সামরিক বাহিনী। বসানো হয়েছে ৫০০টিরও বেশি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা, যাতে ফেসিয়াল রিকগনিশন ও নম্বর প্লেট শনাক্তকরণের সুবিধা রয়েছে।
‎সম্মেলনের সময়ে মথুরা রোড, সরদার প্যাটেল মার্গ, শান্তি পথ ও জনপথসহ অন্তত ৩৫টি প্রধান সড়কে সাময়িক যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ডাইভারশন জারি করা হয়েছে।
‎বিমানবন্দরে যাতায়াত এবং বিমানবন্দর থেকে দিল্লির বিভিন্ন অংশে চলাচলের ওপর সাময়িক প্রভাব পড়লেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সর্বনিম্ন রাখার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ।
‎সম্মেলনের শেষ দিনে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ প্রকাশের মাধ্যমে অধিবেশন সমাপ্ত হবে। এ সময় নরেন্দ্র মোদি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন।
‎বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন