ফ্রান্সজুড়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ছাত্রবিদ্রোহ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৫৭
# শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে বিক্ষোভ শুরু
# কয়েক দশকের মধ্যে সর্ববৃহৎ সহিংসতা
# স্কুল-কলেজগুলোতে তালা, স্তব্ধ প্যারিস
# শিক্ষামন্ত্রী ছাত্রনেতাদের বৈঠকেও সমাধান আসেনি
# পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর রাজপথে বিক্ষোভ
# পুলিশি হেফাজতে ৫ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী
# সহিংসতায় ৭ শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা আহত
শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নানা সংকট সমাধানের দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং অভূতপূর্ব ছাত্র আন্দোলন এখন চরম আকার ধারণ করেছে। যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির সরকার। প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের একটি শহরতলীর হাই স্কুলে ধর্মঘটরত শিক্ষকদের সমর্থনে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে এক চরম জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।
চলমান এই বিক্ষোভে শত শত স্কুল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং যাদের পূর্বে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। সংঘাতের ফলে অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেশজুড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা ব্যানার ও পতাকা হাতে রাস্তায় নেমে আসেন। শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে এদিন দেশজুড়ে ‘কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে সহিংস ছাত্র বিক্ষোভ’ হয়েছে বলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ঁ ল্যকর্ন্যু মন্তব্য করেছেন।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লেন্স শহরে একটি গ্রেনেড হাতে তুলে নেওয়ার পর এক শিক্ষার্থী হাত হারিয়েছেন এবং ট্যুরস শহরে অন্য এক শিক্ষার্থী চোখ হারিয়েছেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, এদিন রাজধানী প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের বিক্ষোভগুলোতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের বাবা-মা ও শিক্ষকরাও রাস্তায় নেমে আসেন। প্যারিস, স্ত্রাসবুর, রেন ও তুলুজসহ অন্যান্য শহরে বিক্ষোভকারীরা সহিংস হয়ে উঠলে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ছোড়ে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কয়েক ডজন শহরে হওয়া মিছিলগুলোতে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ যোগ দিয়েছে। কিন্তু আয়োজকদের ধারণা অনুযায়ী, শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখের মতো।
প্যারিসের পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানীতে প্রায় ৩০০ মানুষ, যাদের অধিকাংশই মুখোশ পড়া, নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। অন্যান্য শহরে সহিংসতায় কিছু দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বড় কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার ৪৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আর ৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্য আহত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী ল্যকর্ন্যু ফ্রান্সজুড়ে হাইস্কুলে ক্লাস সপ্তাহের বাকি সময়ের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন। পার্লামেন্টকে তিনি জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত বিভিন্ন সংঘর্ষে অন্তত ২১৫ জন কিশোর বয়সী এবং ৮৫ জন স্কুল কর্মী আহত হয়েছেন। তিনি বলেছেন, “স্কুল ব্যবস্থায় কয়েক দশকের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় ক্ষতি।”
তার দপ্তর জানিয়েছে, সহিংসতায় ৭০০ জনেরও বেশি পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের একটি হাই স্কুলে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা শুরুতে খুব একটা মনোযোগ পায়নি। শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বাড়তি কর্মী পাঠানোর আশ্বাস দিলে স্কুলটির ধর্মঘট শেষ হয়, কিন্তু ততক্ষণে আন্দোলনের আগুন অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্রনেতা মানেস নাদেল জানান, এরপর আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
প্যারিস ও তার আশপাশের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করতে শুরু করে। কয়েকদিনের মধ্যেই এই চিত্র পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীরা ময়লার ক্যানে আগুন ধরানো, ব্যারিকেড দেওয়া, শিক্ষকদের ওপর আক্রমণ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের পর থেকে এ পর্যন্ত ১০০টিরও বেশি হাইস্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। আলেনকন শহরে এক পুলিশ কর্মকর্তা এক ছাত্রীর গলায় হাত দিয়ে চেপে ধরে আটকে রেখেছিলেন, যার ভিডিও প্রকাশ্যে এলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। কারণ এই পদ্ধতিটি ফরাসি আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আসছেন। দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা অতিরিক্ত ভিড়, অপ্রতুল সরঞ্জাম এবং শিক্ষক সঙ্কটে জর্জরিত। বছরের পর বছর ধরে যেসব ক্লাসরুমে পর্যাপ্ত বেঞ্চ নেই বা শিক্ষক না থাকায় ক্লাস বাতিল হচ্ছে, সেগুলোর ভিডিও ইন্টারনেটে ঘুরপাক খাচ্ছে। ২০১০ সালে ফ্রান্সে জন্মহার বাড়ায় বর্তমানে হাই স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্যাপক বেড়েছে। কিন্তু ২০০৮ সালের তুলনায় এখন শিক্ষকের সংখ্যা অনেক কম, অথচ শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় আড়াই লাখ। বর্তমানে পাবলিক স্কুলের ৭০ শতাংশ ক্লাসরুমে ৩০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, সরকারের পদক্ষেপ ছিল খুব ধীরগতির। শুরুতে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দল ‘এলএফআই’-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিরোধী নেতা জাঁ-লুক মেলাঁশন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অধিকার এবং সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কথা বলে আসছেন। শুধু প্যারিস অঞ্চলেই স্কুলগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ মিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৭৮ লাখ ডলার।
শিক্ষার্থীদের ওপর প্রথমে কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও পরে তা বাজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়। ছাত্রনেতা মানেস বলেন, সরকারের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণই প্রমান করে শিক্ষার্থীরা কেন এত ক্ষুব্ধ। কারণ তাদের কথা কখনোই শোনা হয় না, সরকার কেবল দমনপীড়ন চালিয়ে জবাব দিচ্ছে।
গত সপ্তাহের শেষের দিকে সহিংসতা হঠাৎ বেড়ে যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এটি কেবল ছাত্র আন্দোলন নয়, বরং শহরের সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। কেবল একদিনেই ২,০০০ মানুষকে আটক করা হয়। গত শুক্রবার শিক্ষামন্ত্রী ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসলেও কোনো সমাধান আসেনি, ফলে শিক্ষার্থীরা আবারও মঙ্গলবার মহাসমাবেশের ডাক দেয়।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লিকরনু পার্লামেন্টে বলেন, আমাদের হাই স্কুলগুলোর দরজায় চরম সহিংসতা পৌঁছে গেছে এবং এর তীব্র নিন্দা জানানো উচিত। তিনি জানান, এ পর্যন্ত ২১৫ জন শিক্ষার্থী এবং ৮৫ জন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্মী আহত হয়েছেন, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তবে পুলিশকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার কথা তিনি অস্বীকার করেছেন।
বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সরকার শিক্ষা খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিতে পারছে না। ২০২৭ সালের বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনার চেষ্টার মধ্যে এই আন্দোলন দেশটির অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে ফ্রান্সে ছাত্র আন্দোলন সরকারগুলোর জন্য সবসময়ই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ১৯৬৮ সালের বিখ্যাত মে মাসের ছাত্র আন্দোলন ফরাসি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধর্মঘটে রূপ নিয়েছিল। তবে বর্তমান আন্দোলনকারীদের দাবি বেশ সাধারণ। তারা বলছেন, তারা অনেক বেশি কিছু চান না, তারা কেবল পড়ালেখার মতো ন্যূনতম একটি উপযুক্ত পরিবেশ ও শিক্ষা ব্যবস্থা চান।
আসছে বসন্তে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার আগে দেশটিতে চরম ডান ও চরম বামপন্থি দলগুলোর প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মধ্যেই জনরোষের প্রকাশ দেখা গেল এই বিক্ষোভগুলোতে। মন্থর প্রবৃদ্ধির মধ্যে সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে সরকার চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মিত্র দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর থেকে বাজেট পাসের মতো মৌলিক কাজগুলো সম্পন্ন করতেও সরকারকে হিমশিম থেকে হচ্ছে।
ম্যাক্রোঁ গত মঙ্গলবার ল্যকন্যু ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের একটি জরুরি বৈঠকে তলব করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ফ্রান্সে অভিবাসন ‘নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাওয়ার’ প্রমাণ এসব বিক্ষোভ।
ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘এটি স্কুলের বিষয় নয়, এটি হচ্ছে ইসলাম এক সময়ের এই মহান দেশটিকে অধিকার করে নিতে চাইছে।’
রয়টার্স লিখেছে, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোতে ধর্ম বা অভিবাসন নিয়ে কোনো কিছু নেই, বরং সেগুলোতে শিক্ষক সংকট ও অপ্রতুল তহবিলের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। ফ্রান্সের চরম ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি পার্টি এই প্রতিবাদকে ফ্রান্সের অভিবাসন নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত করেনি। মার্সেই, নঁত ও লিওঁ শহরের আন্দোলনকারীরা ‘তারা আসলে আমাদের নিয়ে ভাবে না’ এবং ‘বেঁচে থাকা না কি পড়াশোনা’, এমন সব লেখা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

