মার্কিন শুল্কারোপ মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনা সাজাচ্ছে চীন!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৬:১৯
মার্কিন শুল্কারোপ মোকাবিলাসহ অর্থনীতিকে আরও জোরদার করতে নতুন পরিকল্পনা খুঁজছে চীন। এ লক্ষ্যে দেশের প্রযুক্তিখাতের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। বৈঠকে বেশ কয়েক বছর পর জনসমক্ষে দেখা গিয়েছে আলীবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা-কে।
স্থানীয় সময় সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) চীনের অন্যতম প্রধান কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও খ্যাতনামা ব্যবসায়ীদের সাথে শি বৈঠক করেন। এ সময় সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি প্রযুক্তি খাতগুলোর বিকাশে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
অনেকদিন ধরেই মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুর কারণ দেখিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) চীনের প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগসহ নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরপরই চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর বাড়তি ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যা কার্যকর হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে।
জবাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়লা আমদানির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেল, খামারের সরঞ্জামাদি ও কিছু যানবাহন আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করে বেইজিং।
পাল্টাপাল্টি এসব পদক্ষেপের ঘটনা নতুন কিছু নয়। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা বাণিজ্যিক বিরোধের জেরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকেই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালেও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন শি জিন পিং। সে সময় তিনি কর ছাড়সহ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ব্যবসায়ীদের।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উন্নতি ঘটেছে এ খাতে। যার সর্বশেষ সংযোজন ডিপসিক। মুক্তির মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই এর মোবাইল অ্যাপটির ২৬ লাখ ডাউনলোড হয়। বর্তমানে বিশ্বে সর্বাধিক ব্যবহৃত কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার প্লাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে এটি।
এ কারণে বিশ্বের বৃহৎ দুই অর্থনীতির চলমান উত্তেজনার মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্টের এই উদ্যোগ দেশটির বেসরকারি প্রযুক্তি নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণের নীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈঠকে আমন্ত্রিত ছিলেন, আলীবাবার জ্যাক মাসহ ডিপসিক, হুয়াই, বিওয়াইডির মতো বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাতারা।
এ বিষয়ে হংকংয়ের গেভিকল ড্রাগোনোমিকস কোম্পানির উপ-গবেষণা পরিচালক ক্রিস্টোফার বেদ্দর বলেন, ‘প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে হলে চীনকে অবশ্যই বেসরকারি প্রযুক্তি খাতে মনোনিবেশ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই চীন সরকারের।’
চীনের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চীনের অর্থনীতিতে বেসরকারি প্রযুক্তির অবদান দেশটির মোট রাজস্ব আয়ের অর্ধেক। এ ছাড়াও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রায় ৬০ শতাংশ ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনে বেসরকারি খাতের অবদান ৭০ শতাংশ।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা লাঘব করতে বেসরকারি খাতকে দেশের সরকার উৎসাহ দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চীনের বেসরকারি প্রযুক্তিখাত এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আধিপত্য বিস্তার শুরু করেছে উল্লেখ করে ডিপসিকের নির্মাতা লিয়াং ওয়েনফেং বলেছেন, ‘চীনের ডিপসিক যুক্তরাষ্ট্রের ওপেনেএআইয়ের জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য হচ্ছে।’
বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি অধ্যাপক শিয়াওয়ান ঝাং বলেছেন, ‘সোমবারের বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল বেসরকারি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা।
তিনি বলেন, ‘এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হলো- সরকারের সমর্থনের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের নিশ্চিত করা। চীনের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকে বিশেষত জ্যাক মা-এর উপস্থিতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
একসময়ের বিখ্যাত এই উদ্যোক্তা ২০২০ সালে তার ফিনটেক কোম্পানি অ্যান্ট গ্রুপের আইপিও বাতিল হওয়ার পর থেকে অনেকটা আড়ালে চলে যান। সে সময় চীনের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সমালোচনা করায় সরকারের ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন পরে তার উপস্থিতি চীনের ব্যবসাজগতে পরিবর্তনের দিকেই নির্দেশ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএইচ/

