Logo

ইসলাম

শীতকাল আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সযোগ

Icon

এ. এ. এম সালমান

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১৭:১৯

শীতকাল আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সযোগ

প্রকৃতির পালাবদলের এক অমোঘ নিয়ম ঋতুচক্র। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ, বর্ষার অঝোর বারিধারা আর শরতের স্নিগ্ধতার পর হিমেল চাদর মুড়ি দিয়ে আমাদের মাঝে আগমন করে শীতকাল। কনকনে ঠান্ডা বাতাস, ঘন কুয়াশার আবরণ আর দিনের সংক্ষিপ্ত পরিসর নিয়ে আসে এক ভিন্নধর্মী আমেজ। সাধারণ দৃষ্টিতে শীতকাল অনেকের জন্য কষ্টের কারণ হলেও একজন মুমিনের জন্য এই ঋতুটি এক বিশেষ রহমত ও অফুরন্ত সওয়াব অর্জনের মৌসুম। এটি ইবাদতের উর্বর মৌসুম, আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সোনালি সোপান। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) এই ঋতুকে ‘মুমিনের বসন্ত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই প্রবন্ধে আমরা কোরআন ও হাদীসের আলোকে শীতকালে ইবাদতের বিশেষ ফজিলত ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব।

শীতকাল মুমিনের বসন্ত

‘বসন্ত’ শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে আসে সজীবতা, উর্বরতা আর নতুন প্রাণের স্পন্দন। বসন্তকালে যেমন গাছপালা নতুন পাতায় সুশোভিত হয়, ফুলে-ফলে ভরে ওঠে, ঠিক তেমন শীতকালে একজন মুমিন ইবাদতের মাধ্যমে তার আত্মাকে সজীব ও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। এই ঋতুতে সে তার আমলের বাগানকে নেক আমলের ফুলে-ফলে সুশোভিত করার সুযোগ পায়। বিশিষ্ট সাহাবী হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “শীতকাল হলো মুমিনের বসন্ত। তার দিনগুলো ছোট হওয়ায় সে রোজা রাখে এবং রাতগুলো দীর্ঘ হওয়ায় সে (তাহাজ্জুদের) নামাজে দণ্ডায়মান হয়।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১১৭৩৬; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস নং ৩৯৪০) উক্ত হাদীসে শীতকালের ইবাদতের দুটি প্রধান দিককে অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এক. দিনের বেলা নফল রোজা পালন। দুই. রাতের বেলা তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য ইবাদত।

শীতকালে রোজা

‘শীতল গনীমত’ বা বিনা পরিশ্রমে প্রাপ্ত সম্পদ। গনীমত বলতে আমরা বুঝি যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে, যা বিজয়ীরা প্রতিপক্ষের কাছ থেকে লাভ করে। যুদ্ধ ছাড়া যেমন গনীমত লাভ করা যায় না, তেমন কষ্ট ও সাধনা ছাড়া বড় কোনো পুরস্কার আশা করা যায় না। কিন্তু শীতকালের রোজা এতটাই সহজ ও আরামদায়ক যে, একে হাদীসে ‘শীতল গনীমত’ বা অনায়াসলব্ধ সম্পদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “শীতকালে রোজা রাখা হলো শীতল গনীমত।” (জামে তিরমিযী, হাদীস নং ৭৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৮৯৭৯)

এটি ‘শীতল গনীমত’ হওয়ার কারণ হল- শীতকালে দিনের পরিধি ছোট থাকে। ফলে রোজার কষ্ট অনুভূত হয় না বললেই চলে। শীতে আবহাওয়া ঠান্ডা থাকায় শরীর থেকে ঘাম ঝরে না এবং পানির চাহিদাও কম থাকে। ফলে পিপাসার কষ্ট একেবারেই হয় না। শীতকালে কর্মব্যস্ত থাকলেও ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে শারীরিক ক্লান্তি ও অবসাদ অনেক কম হয়।

এই সহজতার কারণেই শীতকালের রোজাকে বিনা পরিশ্রমে অর্জিত বিশাল পুরস্কারের সাথে তুলনা করা হয়েছে। একজন মুমিন এই সুযোগে তার কাজা রোজাগুলো আদায় করতে পারেন। সোম ও বৃহস্পতিবারের সুন্নত রোজা, আইয়ামে বীযের (চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখ) রোজা এবং অন্যান্য নফল রোজা পালনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারেন।

বিখ্যাত তাবেয়ী হজরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন, “মুমিনের জন্য শীতকাল কতই না উত্তম! রাত দীর্ঘ হওয়ায় সে নামাজ আদায় করতে পারে। আর দিন ছোট হওয়ায় সে রোজা রাখতে পারে।”

শীতকালে তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল

আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো রাতের শেষভাগে তাঁর দরবারে দণ্ডায়মান হওয়া, যখন সমগ্র সৃষ্টি গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে। এই সময়ের ইবাদত, দোয়া ও কান্নাকাটি আল্লাহ তায়ালার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করত, আর রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করত।” (সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ১৭-১৮)

শীতকালের রাতগুলো অত্যন্ত দীর্ঘ হয়। এশার নামাজ আদায় করে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লেও একজন ব্যক্তির পক্ষে পরিপূর্ণ ঘুম শেষে তাহাজ্জুদের জন্য ওঠা অত্যন্ত সহজ। পূর্ববর্তী যুগের মনীষীগণ শীতের রাতকে ইবাদতের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) বলেন, “কিয়ামুল লাইল (রাতের নামাজ) এমন এক ইবাদত, যা দীর্ঘ না হলে তৃপ্তি মেটে না। আর আল্লাহ তায়ালা শীতের রাতকে মুমিনের জন্য দীর্ঘ করে দিয়েছেন, যাতে সে তার প্রয়োজনমতো ইবাদত করে পরিতৃপ্ত হতে পারে।”

শীতকালে কষ্ট করে অজু করার মহৎ পুরস্কার

শীতের অন্যতম একটি কষ্টকর দিক হলো ঠান্ডা পানি দিয়ে অযু করা। তীব্র শীতে, বিশেষ করে ফজর ও এশার সময় যখন পানি বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়, তখন অজু করাটা মনের (নফস) জন্য একটি বড় পরীক্ষা। কিন্তু এই কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা রেখেছেন অকল্পনীয় পুরস্কার। এই কাজটি গুনাহ মাফ এবং মর্যাদা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “আমি কি তোমাদের এমন কাজের কথা বলব না, যা দ্বারা আল্লাহ তায়ালা গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন? সাহাবীগণ বললেন, ‘অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, “(তা হলো) কষ্টকর মুহূর্তেও পরিপূর্ণভাবে অজু করা, মসজিদের দিকে বেশি বেশি পদক্ষেপ ফেলা এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের জন্য অপেক্ষা করা। আর এটাই হলো ‘রিবাত’ (আল্লাহর পথে সীমান্ত পাহারা দেয়ার সমতুল্য)।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫১)

‘কষ্টকর মুহূর্তে পরিপূর্ণভাবে অজু করা’র সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ হলো শীতকালে ঠান্ডা পানি দিয়ে অজু করা। যখন অলসতা ও আরামপ্রিয়তা মানুষকে এই ইবাদত থেকে বিরত রাখতে চায়, তখন যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই কষ্টটুকু সহ্য করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বহুগুণে বাড়িয়ে দেন এবং তার সগীরা গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। অবশ্য বর্তমানে প্রায় সকল পরিবারে শীতের দিনেও উষ্ণ পানি দিয়ে অজুর ব্যবস্থা আছে। তারপরও শীতের দরুন উষ্ণ পানি দিয়ে অজু করলেও তাতে সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া গেলেও ঠান্ডার অনুভূতি থেকেই যায়। তাই এর দ্বারাও আশা করা যায় যে, হাদীসে বর্ণিত সাওয়াব বা সুসংবাদ এর দ্বারাও অর্জিত হবে, ইনশাআল্লাহ।

শীতকালে দান-সদকা ও মানবিকতা

শীতকাল কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মৌসুম নয়, এটি মানবসেবা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনেরও এক অনন্য সুযোগ। আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাদের কাছে শীতকাল আনন্দের পরিবর্তে অভিশাপ হয়ে আসে। ছিন্নমূল, অসহায় ও দরিদ্র মানুষেরা একটি গরম কাপড়ের অভাবে প্রচণ্ড কষ্টে দিনাতিপাত করে। তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাবার খাওয়ায়।” (সূরা আল-ইনসান, আয়াত ৮)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়াবি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯৯)

জ্ঞানার্জন ও অন্যান্য ইবাদতের সুযোগ

শীতের দীর্ঘ রাতগুলো কেবল তাহাজ্জুদের জন্যই নয়, বরং জ্ঞানার্জনের জন্যও এক চমৎকার সুযোগ। এশার নামাজের পর দীর্ঘ সময় পাওয়া যায়, যা কোরআন তেলাওয়াত, তাফসীর অধ্যয়ন, হাদীস পাঠ এবং ইসলামিক জ্ঞান চর্চার জন্য ব্যয় করা যেতে পারে। দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতের এই শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশে জ্ঞানার্জন অধিক ফলপ্রসূ হয়। এছাড়াও, এই সময়ে বেশি বেশি জিকির-আজকার, দরুদ পাঠ এবং আত্মসমালোচনা করার মাধ্যমে আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জন করা যায়।

উপসংহার : সুযোগের সদ্ব্যবহার করি

জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং প্রতিটি মুহূর্তই খুবই মূল্যবান। শীতকাল আমাদের জীবনে বারবার ফিরে আসে, কিন্তু প্রতিটি শীতই আমাদের আয়ু থেকে একটি বছর কমিয়ে দেয়। তাই বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ হলো, এই ‘বসন্তের’ প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো। দিনে নফল রোজা, রাতের বেলায় তাহাজ্জুদের নামাজ, কষ্ট সত্ত্বেও অজু করা, শীতার্তদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানো এবং জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে আমাদের আমলনামাকে সমৃদ্ধ করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে শীতকালের এই ‘শীতল গনীমত’ ও ‘মুমিনের বসন্ত’ থেকে সর্বোচ্চ উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন!

লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, প্রধান নির্বাহী ও কনসালট্যান্ট, গবেষণা বিভাগ, মাদরাসা প্রকাশনা লিমিটেড

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর