Logo

ইসলাম

শীতের রাত কাটুক জায়নামাজে

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১৩:৫৪

শীতের রাত কাটুক জায়নামাজে

শীতের রাত; নিঃশব্দ, দীর্ঘ, গভীর ও শীতল। প্রকৃতির এই মৌনতা যেন মানুষের মনে জাগিয়ে দেয় বিশেষ অনুভূতি। চারদিকে কুয়াশার আস্তরণ, বাতাসে হিমেল শীতলতা, পথঘাট নিস্তব্ধ, শহর-গ্রাম ঢেকে যায় নীরবতায়। এমন সময়ে অধিকাংশ মানুষ লেপ-কম্বলের উষ্ণতায় ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু শীতের এই রাত শুধু আরামের আহ্বান নয়; এটি আত্মশুদ্ধিরও এক অপার সুযোগ। এই দীর্ঘ রজনী আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার, হৃদয়কে নরম করার, পাপ থেকে মুক্তির এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির সুবর্ণ সময়। তাই বলা যায়-শীতের রাত কাটুক জায়নামাজে, যেন আমাদের রাত হয়ে ওঠে ইবাদতের আলোয় আলোকিত।

শীতের রাতের বিশেষত্ব :

শীতের রাত ঋতুচক্রে সবচেয়ে দীর্ঘ। দিনের আলো কমে আসে, রাত বাড়ে। মানুষ ঘুমে ডুবে যায়, কোলাহল থেমে যায়, পৃথিবীর ব্যস্ততা নিঃশেষিত হয়। এমন সময়ে মন হয়ে ওঠে শান্ত, চিন্তা হয় নির্মল, আল্লাহর স্মরণে মনোযোগ দেওয়া সহজ হয়। মহানবী সা. শীতকে বলেছেন ‘মুমিনের বসন্ত’। কারণ শীতের দিনের রোজা সহজ, আর রাতের নামাজ দীর্ঘ। শীতের রাতের এই নীরবতা ইবাদতের জন্য যেমন উপযোগী, তেমনি আত্ম-অনুসন্ধানেরও সুযোগ সৃষ্টি করে। মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় দরকার হয় যখন সে সকল ব্যস্ততা ভুলে স্রষ্টার সামনে নিজেকে সোপর্দ করতে পারে। শীত সেই সময়গুলোর অন্যতম।

তাহাজ্জুদ শীতের রাতের শ্রেষ্ঠ ইবাদত :

জায়নামাজে শীতের রাত কাটানোর সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো তাহাজ্জুদ নামাজ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা প্রিয় বান্দাদের অন্যতম গুণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, ‘তারা রাতের একাংশে নিজেদের প্রভুর সামনে দাঁড়ায়।’ তাহাজ্জুদ নামাজ এমন এক ইবাদত যা বান্দাকে আল্লাহর সবচেয়ে নিকটে নিয়ে যায়। শীতের রাত লম্বা হওয়ায় তাহাজ্জুদ আদায় করা তুলনামূলক সহজ। ঘুম থেকে ওঠার সময়ও থাকে পর্যাপ্ত। তাই মুমিনের জন্য এটি আধ্যাত্মিক অগ্রগতির সেরা মৌসুম।

তাহাজ্জুদের উপকারিতা :

এক. হৃদয়ের প্রশান্তি ও মানসিক শান্তি এনে দেয়। দুই. পাপ মোচন ও ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করে। তিন. দোয়া কবুলের সময় হওয়ায় মানুষের আশা পূরণের দরজা খুলে দেয়। চার. আখলাক ও চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে। পাঁচ. আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের পথ তৈরি করে।

শীতের রাত ও কুরআন তিলাওয়াত :

জায়নামাজে শুধু নামাজ নয়; বরং কুরআন তিলাওয়াতও শীতের রাতকে মূল্যবান করে তোলে। কুরআনের আয়াত আলোর মতো। শীতের অন্ধকার রাতকে তা হৃদয়ের আলোয় উজ্জ্বল করে। রাতে কুরআন তিলাওয়াত করলে মন হয় শান্ত, চিন্তা হয় পরিশুদ্ধ, ঈমান হয় শক্তিশালী। অনেক সাহাবি ও আলেম শীতের রাতকে কুরআনের ইবাদতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। কারণ, মনোনিবেশ ও খুশু-খুজু নিয়ে তিলাওয়াত করার জন্য নিস্তব্ধ রাতই সবচেয়ে অনুকূল।

ইস্তেগফার ও কান্নার রাত :

মানুষ ভুলের পুতুল। জীবনের পথে চলতে গিয়ে মানুষ অনেক পাপ করে। শীতের নিঃশব্দ রাত সেই পাপের জন্য কান্না করার সর্বোত্তম সময়। জায়নামাজে দাঁড়িয়ে বা সিজদায় পড়ে যদি কেউ আন্তরিকভাবে ক্ষমা চায়-আল্লাহর দরজা তার জন্য খুলে যায়। শীতের রাতের কঠিনতা মানুষকে নম্র করে, বিনম্রতা শেখায়। ঠাণ্ডা বাতাস যখন গায়ে লাগে, তখন বান্দা উপলব্ধি করে তার দুর্বলতা, অসহায়ত্ব। এই উপলব্ধি তাকে আল্লাহর দিকে আরও বেশি ঝুঁকিয়ে দেয়।

শীতের রাত ও দোয়ার শক্তি :

রাতের শেষ তৃতীয়াংশ দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়। হাদিসে এসেছে- আল্লাহ এ সময় বান্দাকে ডাকেন, ‘কে আছে আমার কাছে দোয়া করবে, আমি কবুল করব।’ শীতের দীর্ঘ রাতে এই বিশেষ সময় ধরার সুযোগ অনেক বেশি। জায়নামাজে দাঁড়িয়ে নিজের, পরিবারের, সমাজের এবং উম্মাহর জন্য দোয়া করা ইবাদতের অন্যতম বড় কাজ। একটি দোয়া মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। শীতের রাত সেই বদলের মুহূর্ত হতে পারে।

শীত উত্তম নিয়তের পরীক্ষা :

শীতের কনকনে পরিবেশে উষ্ণ বিছানা ছেড়ে নামাজে দাঁড়ানো সহজ নয়। এটি আত্মাকে শক্তিশালী করে, নফসকে নিয়ন্ত্রণে আনে, ঈমানকে দৃঢ় করে। যে ব্যক্তি শীতের রাতেও ইবাদতের জন্য জেগে ওঠে, সে প্রকৃত মুজাহিদ। কারণ সে নিজের ইচ্ছাকে পরাস্ত করে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়।

যায়নামাজে কাটানো রাতের প্রভাব জীবনে :

এক. চরিত্র গঠন। রাতের ইবাদত মানুষকে বিনয়ী, শান্ত, ধৈর্যশীল ও পরহেজগার করে। দুই. পাপ থেকে দূরে থাকা। নামাজ ও কুরআনের নুর পাপের পথকে অন্ধকার করে দেয়। ফলে বান্দা ভুল থেকে বাঁচে। তিন. জীবনে বরকত। রাতে জেগে ইবাদত করলে দিনের কাজে আল্লাহ বরকত দেন। মনোযোগ, শক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা বাড়ে। চার. দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্য। মুমিনের প্রকৃত সাফল্য আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। রাতের ইবাদত সেই সন্তুষ্টির পথে সবচেয়ে শক্তিশালী পদক্ষেপ।

আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের রাত :

শীতের রাত শুধু ঠাণ্ডার গল্প নয়; এটি আত্মার উষ্ণতার সময়। যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকে, তখন একটি মন আল্লাহর দিকে ঝুঁকে যায়- এই দৃশ্য আকাশের ফেরেশতাদের সাক্ষী করে। জায়নামাজে কাটানো শীতের রাত মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনে, হৃদয়কে পবিত্র করে, ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং আল্লাহর নৈকট্য দান করে।

তাই আসুন- উষ্ণতার খোঁজ শুধু কম্বলে নয়, বরং ইবাদতে; নিরাপত্তার খোঁজ শুধু আশ্রয়ে নয়, বরং আল্লাহর রহমতে; জীবনের সৌন্দর্য শুধু দুনিয়ায় নয়, বরং আখিরাতে। শীতের রাত কাটুক জায়নামাজে। এ রাত হোক অশ্রæর, ইস্তেগফারের, দোয়ার এবং আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের রাত।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর