২০২৬-এর সূচনায় নতুন শপথ
কোরআন-হাদিসের আলোকে আল্লাহমুখী জীবন
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫০
সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। যে সময় চলে যায়, তা আর কখনো ফিরে আসে না। একটি নতুন বছরের আগমন তাই নিছক ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং নতুনভাবে জীবন গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ২০২৬ সালের সূচনায় আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এই নতুন বছর কি আগের বছরের পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি আমল ও জীবনে বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা ঘটবে?
ইসলাম সময়কে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে। আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেন- "শপথ সময়ের, নিশ্চয়ই মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত। তবে তারা নয়- যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।" (সূরা আল আসর: ১-৩)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়-সময় পার করা নয়, বরং সময়কে ঈমান ও সৎকর্মে কাজে লাগানোই মুমিনের সফলতা।
সময় ও জীবনের হিসাব
নববর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-জীবনের আয়ু ক্রমেই কমছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, "তিনি রাত ও দিনকে একে অপরের পেছনে আবর্তিত করেন- যে ব্যক্তি উপদেশ গ্রহণ করতে চায় কিংবা কৃতজ্ঞ হতে চায় তার জন্য।"(সূরা আল-ফুরকান ৬২) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন- "দুটি নিয়ামত এমন আছে, যেগুলো সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত: সুস্থতা ও অবসর।" (সহীহ বুখারী: ৬৪১২) নতুন বছর আমাদের জন্য একটি হিসাবের ঘণ্টা বাজায়- আমরা কি সুস্থতা ও সময়কে আল্লাহর পথে ব্যয় করছি, নাকি গাফিলতিতে নষ্ট করছি?
নিয়ত ও লক্ষ্য নির্ধারণ
ইসলামে সব পরিবর্তনের শুরু হয় নিয়ত থেকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-"নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে। "(সহীহ বুখারি: ১: সহিহ মুসলিম: ১৯০৭)
২০২৬ সালের শুরুতেই আমাদের নিয়ত স্পষ্ট হওয়া দরকার- আমরা কী হতে চাই? আল্লাহ তাআলা কোরআনে ঘোষণা করেছেন-"আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য।" (সূরা আজ-জারিয়াত:৫৬) এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় নতুন বছর হোক আল্লাহকে কেন্দ্র করে জীবন গড়ার নতুন অঙ্গীকার।
তওবা ও আত্মশুদ্ধির নবদ্বার
মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয়। কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য হলো- ফিরে আসার পথ সবসময় খোলা। আল্লাহ তাআলা বলেন- "হে আমার বান্দারা। যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই। আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। (সূরা যুমার :৫৩) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- "প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুল করে, আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম তারা, যারা তওবা করে।" (সুনান তিরমিজি, ২৪৯৯) ২০২৬ সাল শুরু হোক আন্তরিক তওবা, পাপ বর্জন এবং আল্লাহর দিকে পূর্ণ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে।
ফরজ আমলে দৃঢ়তা
ইমানদার জীবনের ভিত্তি ফরজ আমল। বিশেষ করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। আল্লা হতাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। (সূরা আল-আনকাবুত: ৪৫) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন- "বান্দা ও কুফরের মাঝে পার্থক্য হলো নামাজ ত্যাগ।"
(সহিহ মুসলিম: ৮২) নতুন বছরে আমাদের অঙ্গীকার হোক- নামাজ, রোজা, যাকাত ও অন্যান্য ফরজ ইবাদতে অবহেলা নয়, বরং নিয়মিত ও যত্নশীল হওয়া। কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা।কোরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়, বরং জীবন পরিচালনার সংবিধান। আল্লাহ তাআলা বলেন- "এই কোরআন মানুষকে সেই পথের দিশা দেয়, যা সবচেয়ে সরল।" (সূরা বনি ইসরাইল:৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়। "(সহীহ বুখারি: ৫০২৭) ২০২৬ সাল হোক কোরআন পড়া, বোঝা ও জীবনে বাস্তবায়নের বছর।
চরিত্র ও আখলাকে পরিবর্তন
ইসলাম কেবল ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি চরিত্র সংশোধনের ধর্ম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- "আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্র পরিপূর্ণ করার জন্য। "(মুয়াত্তা মালিক: ১৬১৪) আরও বলেছে "কিয়ামতের দিন মুমিনের পাল্লায় সর্বাধিক ভারী হবে উত্তম চরিত্র। (সুনান তিরমিজি,। ২০০২) নতুন বছরে মিথ্যা, হিংসা, অহংকার ও বিদ্বেষ ত্যাগ করে ধৈর্য, বিনয় ও সত্যবাদিতাকে জীবনের অংশ করা জরুরি।
সামাজিক দায়িত্ব ও মানবিকতা
ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজ- দুটোকেই সমান গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-"নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন। "(সূরা আন-নাহল : ৯০) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- "মানুষের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় সে ব্যক্তি, যে মানুষের উপকারে আসে। "(মু'জামুল আওসাত: ৬১৯২) ২০২৬ সাল হোক অসহায়, দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বছর।
আত্মমূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি
বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের হিসাব নিজেই নেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-"বুদ্ধিমান সে ব্যক্তি, যে নিজের নফসের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।"(সুনান তিরমিজি: ২৪৫৯)
নতুন বছরে নিয়মিত আত্মসমালোচনা, আমলের হিসাব ও আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি আল্লাহর ওপর ভরসা ও দোয়া।
সব পরিবর্তনের মূল শক্তি আল্লাহর সাহায্য। আল্লাহ তাআলা বলেন- "যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩) নতুন বছরের প্রতিটি পদক্ষেপে দোয়া, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক।
পরিশেষে বলতে চাই, ২০২৬ সাল যেন কেবল নতুন বছরের শুভেচ্ছায় সীমাবদ্ধ না থাকে। এটি হোক আত্মশুদ্ধি, আমল বৃদ্ধি এবং জীবন পরিবর্তনের বাস্তব সূচনা। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তওবা ও সংশোধনের সুযোগ এখনো আছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে জীবন গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েই শুরু হোক নতুন বছর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এক নতুন অধ্যায়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ২০২৬ সালকে আমল ও জীবন পরিবর্তনের বছর হিসেবে কবুল করার তাওফিক দান করুন-আমিন।
লেখক: ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

