Logo

ইসলাম

জাতীয় মিম্বার থেকে

মুসলিম কখনো নামাজ কাজা করতে পারে না

মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেক

ইনজামামুল হক

ইনজামামুল হক

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫০

মুসলিম কখনো নামাজ কাজা করতে পারে না

নামাজের কথা বুঝাতে পারছে না, জানতে পারছে না। অনেক সময় নামাজ শুরু করে দেয় কিন্তু কতো রাকাত পড়ল, কতো রাকাত পড়ল না খবর নাই। পাশে আরেকজন দড়িয়ে বলে দিচ্ছে, তাও ঠিক রাখতে পারছে না।' এটা ওজরের হালাত। নতুবা মুসলিম আবার নামাজ কাজা করবে, এটা হতেই পারে না। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতই পড়তে হবে। নামাজ মুমিনদের জন্য আল্লাহ যে ফরজ করেছেন, এটা নির্ধারিত সময়ের ফরজ। মানে প্রত্যেক নামাজের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সময়ের শুরু এবং শেষ, এর ভিতরেই নামাজ আদায় করে নিতে হবে।

'নামাজের ক্ষেত্রে উদাসীন হওয়া যাবে না। নামাজের ব্যাপারে উদাসীন হবে মুসল্লি। এটা কেমন কথা? নামাজ কাজা করা, নিয়মিত না পড়া। এসব নামাজের উদাসীনতা। এক ওয়াক্ত পড়ল আরেক ওয়াক্ত পড়ল না। আজকে পড়ল তো কালকে পড়ল না। এমন যেন না হয়। আরেক উদাসীনতা হলো সময়মত পড়ল না, সময় পার করে দিল। ঘুম থেকে যদি চেতন না পায়, ঘুম না ভাঙ্গে এটা একটা ওজর। কিন্তু কার জন্য ওজর? যার ঘুমের আগে, শোয়ার সময় নিয়ত ছিল; আমি উঠে নামাজ পড়ব ইনশাআল্লাহ।

নিয়ত ছিল, তবে কোনো কারণে টের পায় নাই। এটা ওর জন্য ওজর। কিন্তু যে অভ্যাসে বানিয়ে নিয়েছে- আড্ডার মধ্যে সময় কাটাবে, মোবাইলে সময় কাটাবে আর ঘুমাতে ঘুমাতে রাত একটা,

দুইটা বাজাবে। শোয়ার সময় তার কোনো নিয়ত নাই যে, আমি উঠে ফজর পড়ব। তাহলে এই ব্যক্তির ঘুম না ভাঙা এটা ওজর হিসেবে ধরা হবে না। তুমি বদঅভ্যাস বানিয়া নিয়েছে। ফজরের নামাজের জন্য আমাকে উঠতে হবে সেটার জন্য তো আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। তোমার প্রস্তুতির খবরই নাই। নামাজ আদায় করার নিয়তই নাই।

যারা নামাজি তারা দোয়া করে ঘুমায়। কোনো কারণে কোনোদিন দেরি হয়ে গেলে শোয়ার আগে এলার্ম দেয় বা কাউকে দায়িত্ব দেয়। ভাই আমাকে জাগিয়ে দিও। আল্লাহর কাছে বলে, আল্লাহ আমাকে তৌফিক দান করেন যাতে ঠিক সময় আমি নামাজ আদায় করতে পারি। সূরাতুল কাহফের শেষের যে দুই একটা আয়াত: "ইন্নাল্লাজিনা আমানু ওয়া আমিলুস সালিহাত কানাত লাহুম জান্নাতুল ফিরদাউসি নুজুলা" এখান থেকে সুরার শেষ পর্যন্ত পড়ে শুইবেন। তাহলে সজাগ পাবেন তাহাজ্জুদের জন্য অনেকের ঘুম ভাঙ্গে না। শীতকালের এত লল্ল রাত তাও শেষ রাতে উঠ্য হয় না। এজন্য চেষ্টা করতে হবে। দোয়া করতে হবে যে, আল্লাহ আপনি আমার অল্প ঘুমে আমাকে তৃপ্তি দান করেন। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাতে বড় তাবেয়ী একজন ইমামের এই দোয়া বর্ণিত আছে, "আল্লাহুম্মাশফিনি মিনান নাওমি বি ইয়াসির ওয়ারজুকনি সাহারান ফি ত-আতিক" আল্লাহ অল্প ঘুমে যাতে আমার তৃপ্তি হয়ে যায়। ঘুমের যে ফায়দা, ঘুমের যে উপকার ওটা অল্প ঘুমে যেন আমি পেয়ে যাই। অনেকে আছে সারারাত ঘুমায় কিন্তু ঘুমের ফায়দাটা নাই। ঘুম ভাঙার পরে মনে হয় স্বস্তি নাই। অথচ আল্লাহ তায়ালা ঘুম দিয়েছেন 'সুবাতান' হিসেবে, সব ক্লান্তি দূর হওয়ার জন্য। কিন্তু অনেকের অবস্থা এমন, ঘুমালো অনেক কিন্তু উঠার পরে সেই ক্লান্তি, সেই অস্থিরতা, মাথা জ্যাম হয়ে আছে।

তাই উনি বলছেন, আল্লাহ অল্প ঘুমে আমাকে তৃপ্ত করে দেন। আর যে সময় বাঁচবে ওই সময় আপনার ইবাদত করার তৌফিক আমাকে দান করেন।

আমরা নামাজের ব্যাপারে উদাসীন হব না। নামাজি হতে হবে, নিয়মিত মুসল্লি হতে হবে। উদাসীন নামাজি আল্লাহ পছন্দ করেন না। সময় চলে যাচ্ছে, কাজা হয়ে যাচ্ছে। খবর নাই। সুন্দর করে পড়ার চিন্তা নাই, শেখার চিন্তা নাই, এসব উদাসিনতা আল্লাহ পছন্দ করেন না। নামাজি একজন আদর্শবান ব্যক্তি হবে। তার চলাফেরা, লেনদেন, আখলাক এমন হবে যেন সে অনুসরণযোগ্য হয়।

আজকের আলোচনা নামাজকে সুন্দর করা। নিয়মিত পড়ছি কিন্তু সুন্দর হচ্ছে না। নামাজ সুন্দর করার ব্যাপারে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।

সাহাবী উবাদাহ ইবনুস সামিত রা, বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমি নবীজির (সা.) কাছ থেকে শুনেছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আল্লাহ বান্দাদের উপর ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে ওযু করে, সময়মত নামাজ আদায় করে, রুকু-সিজদা ও যুক্ত-যুজু ঠিক রাখে। আল্লাহর কাছে তার জন্য ক্ষমার অঙ্গীকার রয়েছে। আর যে তা করে না, তাকে আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করবেন, চাইলে শাস্তি দেবেন।

নামাজ সুন্দর করতে হলে ওযুও সুন্দর হতে হবে। ওযুতে পানির অপচয় করা যাবে না। অল্প পানিতে ওযু করা সম্ভব। এমনকি সমুদ্রের পাশেও থাকলে অপচয় করা যাবে না। শীত, কষ্ট, অস্বস্তি সবকিছুর পরও সুন্দরভাবে ওযু করা বড় নেক আমল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কষ্টের মধ্যেও ওযু সুন্দরভবে করা অনেক বড় সওয়াবের কাজ।

ওযু স্বতন্ত্র একটা ইবাদত। এটার জন্য আলাদা সওয়াব দান করবেন আল্লাহপাক। এই না যে, নামাজের সওয়াবের মধ্যে এইটা চলে গেছে। ওযুর জন্য আলাদা সওয়াব দিবেন আল্লাহ তাআলা। আর যদি ওষুর শেষে এই দোয়া করি, "আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।" আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিবালাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।। কালিমায়ে শাহাদাত। অথবা এই অর্থের কালিমায়ে শাহাদাত আপনি পড়লেন, তাহলে আল্লাহ তাআলা জান্নাতের দরজা খুলে দিবেন।

এরপরে ওযুর সময় কত অনুভূতি মনে জাগ্রত করা যায়। ওযুর দ্বারা গুনাহ মাফ হয়। আমি তওবাই করতে থাকি ওযু করতে করতে "আল্লাহুম্মাগফিরলি জাছি, ওয়া ওয়াসসি লি ফি দারি, ওয়া বারিক লি ফি রিষকি।"

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু করেছেন, নামাজ পড়েছেন, তারপরে এই দোয়া পড়েছেন। কোনো বর্ণনায় এসেছে- ওযু করার পর এই দোয়া পড়েছেন। এই দোয়া ওযুর পরে পড়া বা ওযুর মাঝেও পড়া যায়।

আল্লাহ বলেছেন ওযুর দ্বারা গুনাহ মাফ হয়। এটা সম্বীরা গোনাহ। কিন্তু আমার তো কেবল সগীরা গুনাহ না, কত কবীরা গুনাহ করে রেখেছি। আল্লাহ আমি সবকিছু থেকে তওবা করছি, আপনি আমার সব গুনাহ মাফ করে দেন। তওবা করতে করতে ওযু করি তাইলেই তো ওই কথাটা আসবে, "আল্লাহুম্মাজআলনি মিনাত তাওয়াবিন, ওয়াজআলনি মিনাল মুতাতাহহিরিন।"

আল্লাহ আপনি আমাকে তওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করেন। এমন যেন না হয় ওযুর মধ্যেও আমি উদাসীন। নামাজের মুশুগুজুর জন্য আমরা পেরেশান। আমাদের মুরুব্বিরা বলেছেন, নামাজের খুশুধুজুর ফিকির ওযু থেকেই শুরু করো। আজান শুনলা, তখন থেকেই প্রস্তুতি নাও। আজানের জবাব দাও। ওযু করার সময় খেয়াল রাখো। আল্লাহ আমার দিলটাও যেন পরিষ্কার করে দেন।

এরপরে ধীরে ধীরে তাওয়াজুর সাথে মসজিদে যাও। আল্লাহকে স্মরণ করো। মসজিদে ডান পা দিয়ে ঢুকো। জুতা খোলার সময় বাম পা আগে খোলো, এরপর ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করো। দেয়া পড়ো, "বিসমিল্লাহি ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ, আল্লাহুয়াফতাহ লি আবওয়াবা রাহমাতিক।"

আল্লাহ আমার জন্য রহমতের দরজাগুলো খুলে দেন। মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় পড়বে, "বিসমিল্লাহি ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ, আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা মিন ফাদলিক।"

"আল্লাহুম্বা আসিমনি মিনাশ শাইতানির রাজিম।" এভাবে যদি বান্দা মসজিদে আসে এবং এভাবে বের হয়, তার চিন্তা-চেতনা ও আখলাকে পরিবর্তন আসবেই। যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে ওযু করবে, সময়মত নামাজ আদায় করবে, রুকু-সেজদা ও খুশুথুজু পূর্ণ করবে; আল্লাহ তার সাথে ক্ষমার ওয়াদা করেছেন। আর যে ঠিকমত ওযু ও নামাজ আদায় করবে না, তার জন্য কোনো ওয়াদা নেই। আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করবেন, চাইলে শাস্তি দিবেন।

সাহাবায়ে কেরামকে নবীজি (সা.) নামাজ দেখিয়ে শিখিয়েছেন। রুকু কিভাবে হবে। হাঁটুর উপর দুই হাত, আঙ্গুল নিচের দিকে, পিঠ সোজা, মাথা-পিঠ-কোমর এক বরাবর। যেন পিঠের উপর কিছু রাখা হলে পড়ে না যায়।

রুকুতে গিয়ে স্থির হতে হবে। "সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম" তিনবার পড়বে। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়াবে, পুরো শরীর স্থির হবে তাড়াহুড়া করা যাবে না।

সেজদায় সাত অঙ্গ ব্যবহার হবে, কপাল ও নাক, দুই হাত, দুই হাঁটু, দুই পায়ের পাতা। নাক ও কপাল দুটোই জমিনে লাগবে। পায়ের আঙ্গুল কেবলামুখী থাকবে।

এভাবে রুকু, সেজদা, কওমা, জলসা সব স্থির ও সুন্দরভাবে করতে হবে। নামাজ শিখতে হবে। দেখাদেখি যথেষ্ট না। কিরাত সহীহ হতে হবে। সূরা ফাতেহ্য, বিসমিল্লাহ। সব শুদ্ধ উচ্চারণে শিখতে হবে। অক্ষরের মাখরাজ ঠিক করতে হবে। আমরা সকলেই সহীহ শুদ্ধভাবে কোরআন ও নামাজ শিখার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন। আমীন।


অনুলিখন : মাওলানা কাজী ইনজামামুল হক। সহ-সম্পাদক, দৈনিক বাংলাদেশের খবর

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

মিম্বার ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর