Logo

ইসলাম

মায়ের পেটে জীবনের সূচনা ও আল্লাহর পরিকল্পনা

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:০৯

মায়ের পেটে জীবনের সূচনা ও আল্লাহর পরিকল্পনা

প্রতীকী ছবি

মানুষের সৃষ্টি একটি বিস্ময়কর, সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। এটি মহান আল্লাহ তায়ালার কুদরত ও হিকমতের নিখুঁত নিদর্শন। একটি ক্ষুদ্র শুক্রবিন্দু থেকে পূর্ণাঙ্গ মানবশিশুতে রূপান্তরিত হওয়া, প্রতিটি ধাপে আল্লাহর পরিকল্পনার পরিচয় বহন করে। মানবসৃষ্টির এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে বিস্তারিত নির্দেশ রয়েছে। তবে অনেকের মনে এক প্রশ্ন ঘুরপাক খায়-মায়ের পেটে সর্বপ্রথম কোন অঙ্গ সৃষ্টি হয়?

কোরআনের দিকনির্দেশনা

পবিত্র কোরআন মানবসৃষ্টিকে ধাপে ধাপে সংঘটিত প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- "নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে। অতঃপর তাকে শুক্রবিন্দু হিসেবে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থাপন করেছি। এরপর শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করেছি, তারপর সেই জমাট রক্তকে মাংসপিন্ডে রূপান্তর করেছি; অতঃপর সেই মাংসপিণ্ডকে অস্থিতে পরিণত করেছি এবং অস্থির ওপর মাংস আবরণ দিয়েছি; এরপর তাকে অন্য এক নতুন সৃষ্টি হিসেবে গড়ে তুলেছি। অতএব কত মহান আল্লাহ, সর্বশ্রেষ্ঠ স্রষ্টা।"(সূরা আল-মুমিনুন: ১২-১৪)

এই আয়াতগুলি মানবসৃষ্টির ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। তবে কোথাও নির্দিষ্ট করে কোনো অঙ্গকে "প্রথম" বলা হয়নি। এটি আমাদের শেখায়ড়মানবসৃষ্টি একটি সম্পূর্ণ ও সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে

হাদিসে গর্ভের ভেতরের বিকাশ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন- "তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন শুক্রবিন্দু হিসেবে জমা থাকে, এরপর অনুরূপ সময় জমাট রক্ত থাকে, তারপর অনুরূপ সময় মাংসপিণ্ড থাকে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা পাঠান, যিনি তার রিজিক, আয়ু, আমল ও সে সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগা-এই চারটি বিষয় লিখে দেন। তারপর তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়।" (সহীহ বুখারি: ৩২০৮; সহীহ মুসলিম: ২৬৪৩) এই হাদিস থেকে বোঝা যায়- রূহ প্রবেশের আগে মানবদেহ একটি জৈবিক কাঠামো হিসেবে গড়ে ওঠে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গকে প্রথম বলা হয়নি।

ইসলামের নীতি ও আলেমদের ব্যাখ্যা

ইসলাম শিক্ষা দেয়- যেখানে স্পষ্ট দলিল নেই, সেখানে নিশ্চিত দাবি করা থেকে বিরত থাকা। তবে তাফসির ও বাস্তব পর্যবেক্ষণের আলোকে আলেমরা মনে করেন, ভ্রূণের প্রথম কার্যকর অঙ্গ হলো হৃদপিণ্ড। হৃদপিণ্ড স্পন্দনের মাধ্যমে রক্ত চলাচল শুরু হয় এবং অন্যান্য অঙ্গের বিকাশের জন্য পরিবেশ তৈরি হয়। এটি আকীদাগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং মানবসৃষ্টির ধারাবাহিকতা বোঝার একটি গ্রহণযোগ্য বিশ্লেষণ।

হৃদয়ের গুরুত্ব

কোরআনে হৃদয়ের গুরুত্ব বারবার উল্লেখ হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- "তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? তাহলে তাদের এমন অন্তর হতো, যা দিয়ে তারা বুঝতে পারত।"

(সূরা আল-হজ: ৪৬) এছাড়া বলা হয়েছে- "নিশ্চয়ই এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার অন্তর আছে।" (সূরা ক্বাফ: ৩৭) হৃদয় কেবল শারীরিক অঙ্গ নয়; এটি উপলব্ধি, বোধশক্তি ও সচেতনতার কেন্দ্র। মানবজীবনের সূচনালগ্নে হৃদয়ের ভূমিকা এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞান ও বাস্তব পর্যবেক্ষণ

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, ভ্রূণের তৃতীয় সপ্তাহে হৃদপিণ্ড স্পন্দিত হতে শুরু করে। তখনো অন্যান্য অঙ্গ পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত হয়নি। কোরআনের ধাপে ধাপে সৃষ্টির বর্ণনার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞান মিল রেখে দেখা যায়, হৃদপিণ্ডই ভ্রূণের প্রথম কার্যকর অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত।

রূহ প্রবেশ ও নতুন সৃষ্টি

কোরআনে বলা হয়েছে- "তারপর আমি তাকে অন্য এক নতুন সৃষ্টি হিসেবে গড়ে তুলেছি। "(সূরা আল-মুমিনুর: ১৪) কেবল দেহ নয়, বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সত্তায় পরিণত হয়। এখান থেকেই মানবজীবনের দায়িত্ব ও হিকমত শুরু হয়। পরিশেষে বলতে চাই, সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, কোরআন ও হাদিস মানবসৃষ্টির ধাপ স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেও নির্দিষ্টভাবে "সর্বপ্রথম কোন অঙ্গ সৃষ্টি হয়" উল্লেখ করেনি। ইসলামের শিক্ষা হলো, নিশ্চিত দলিল ছাড়া নিশ্চিত দাবি না করা। তবে আলেমদের ব্যাখ্যা ও বাস্তব পর্যবেক্ষণের আলোকে হৃদপিণ্ডকে ভ্রূণের প্রথম কার্যকর অঙ্গ হিসেবে ধরা হয়। মানবসৃষ্টির এই বিশ্লেষণ আমাদের কেবল জ্ঞান বৃদ্ধি করে না; বরং মনে করিয়ে দেয়-আমাদের জীবন শুরু থেকেই আল্লাহ তায়ালার পরিকল্পনার অধীনে। আমরা নিজের ইচ্ছায় সৃষ্টি হয়নি; বরং আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। এই উপলব্ধি আমাদের বিনয়ী করে, অহংকার দূর করে এবং স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জাগায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এই সত্য উপলব্ধি করার তাওফিক দিন, আমাদের অন্তরকে হেদায়াতের আলোয় আলোকিত করুন এবং আমাদের জীবনকে আপনার নির্দেশনামাফিক পরিচালিত করার ক্ষমতা দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর