Logo

ইসলাম

ইসরা ও মিরাজ

বন্ধুর মুখে হাসি ফোটানোর অনন্য আয়োজন

Icon

মুফতি সামিউল ইসলাম

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৭

বন্ধুর মুখে হাসি ফোটানোর অনন্য আয়োজন

জীবন ভীষণ সুন্দর। জটিলতা আরও ভয়ংকর সুন্দরের জন্ম দেয়। তবে জটিলতার কারণে মন ভেঙে যায়। এতে তার প্রভাব শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রেই পড়ে। এ সময় পরিবারের মানুষজন, বন্ধুবান্ধব সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করলেও অনেক সময় কাজে আসে না। মানব জীবনের বাস্তবতায় দেখা যায়, এ সময় একা কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসা বরাবরই ফলপ্রসূ হয়। কারণ একা ভ্রমণ করলে অতীতকে ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়া সহজতর হয়। অনেক নিত্যনতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া যায়। এগুলো জীবনের অর্থ পাল্টে দেয়। নানা দুশ্চিন্তায় কমে যাওয়া আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। নতুন মানুষ, নতুন স্থানের সঙ্গে পরিচিতি পুরোনো স্মৃতি থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনে। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের গল্প শুনে মনে সান্ত¡না পাওয়া যায়। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সাহস সঞ্চার হয়।

একা ভ্রমণের মাধ্যমে নিজের অনেক গুণ আবিষ্কার করা যায়; যেগুলো কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। নতুন অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনের কারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। একা থাকার কারণে নিজের পছন্দ অনুযায়ী কাজ করা যায়। অবশ্য একা ভ্রমণ বেশি দিনের না হওয়াই ভালো। সে ক্ষেত্রে একাকিত্ব বিষণ্নতার আরেকটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চল্লিশ বছর বয়সে পদার্পণের ঠিক প্রথম দিন থেকেই রাসুলুল্লাহ সা. এর মাথার উপর যে গুরু দায়িত্ব অর্পিত হয় সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে লাগাতার দশটি বছর তাকে নানা কটুকথা, গালিগালাজ, মানসিক চাপ, শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। লাগাতার তিন বছর অনুসারী এবং আত্মীয়-স্বজন নিয়ে অসহনীয় মানবেতর জীবন অতিবাহিত করতে হয়। সেই জীবন থেকে যখন কিছুটা নিষ্কৃতি পাওয়া যায় তখনই সমাজের আঘাতের ঢাল স্বরূপ প্রাণপ্রিয় পিতৃতুল্য চাচার ছায়া উঠে যায়। এই শোকের ব্যথা মন থেকে এবং নীরব কান্নার অশ্রæ চোখ থেকে শুকাতে না শুকাতেই ঘরে এসে যেই প্রিয়তমা সহধর্মিণীর আঁচল তলে কিছুটা আশ্রয় নিতেন তিন দিনের মাথায় সেও ওপারে চলে যায়। দায়িত্ব পালনের স্বার্থে নিজ এলাকা ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় যখন পয়গাম পৌঁছাতে যান সেখানেও পাগল বলে পিছন থেকে ধাওয়া করা হয়। কংকর-পাথর নিক্ষেপ করে আপাদমস্তক দেহ রক্ত রঞ্জিত করা হয়। বারবার বেহুশ হয়েও কোনো ছাড় পান নি। ভগ্ন হৃদয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। এভাবে তার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে এবং মানসিকভাবে তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন।

এক: দায়িত্ব পালন করার পর থেকে এই যে এতগুলো অমানবিক যন্ত্রণা ও কষ্ট বুকে চেপে ছিলো; স্বাভাবিকভাবেই রক্ত-মাংসের একজন মানুষের মনে হতাশা, ব্যর্থতার গ্লানি এবং দুশ্চিন্তার দানা বাঁধতেই পারে। প্রশস্ত হৃদয়ও এসব ডিপ্রেশনে সংকীর্ণ হয়ে যায়। হৃদয়ের মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর বন্ধুর মনকে এসব চাপ ও প্রেসার থেকে মুক্ত করতে এবং তার মুখে হাসি ফুটানোর জন্যেই সৃষ্টি জগতের অনুপম ও অদ্বিতীয় ইতিহাস রচনা করেন এক নিশি রাতের ইসরা ও মেরাজের মাধ্যমে। মৌলিকভাবে এটিই ইসরা ও মেরাজের প্রধান রহস্য।

দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তাআলা এই মোজেজার মাধ্যমে তার কাছে রাসুলুল্লাহ সা. এর মর্যাদা ও অবস্থান সৃষ্টি জগতের সামনে প্রকাশ করেছেন। তাকে এত কাছে টেনে নিয়েছিলেন যেখানে তিনি লৌহে কলমের লেখার আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন। নবী-ফেরেশতা কোনো মাখলুক সেখানে পৌঁছতে পারে না। আল্লাহ তাআলার এত কাছাকাছি হয়েছিলেন যে, তাকে তিনি সরাসরি দেখেছিলেন বলেও কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়। 

তৃতীয়ত: মসজিদে আকসায় সকল নবীর ইমামতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাকে নবিদের ইমাম ও নেতা বানিয়েছেন। তার শরিয়তের মাধ্যমে সকল শরিয়তকে রহিত করেছেন এবং পরিষ্কার করে দিয়েছেন, কেয়ামত পর্যন্ত আগত সকলকেই তার শরিয়তের অনুসরণ করতে হবে।

চতুর্থত: অদৃশ্য বিষয় যুক্তির মাধ্যমে বোধগম্য হয় না। যে কারণে মানব মনে নানাবিধ প্রশ্নের উদয় হয়। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদানের জন্যই আল্লাহ তাআলা তাকে অদৃশ্য জগতের বহু নিদর্শন দেখিয়েছেন। জান্নাত-জাহান্নাম দর্শন করিয়েছেন। সাত আসমানে নবি-রাসুলগণের সাক্ষাৎ লাভ করিয়েছেন। তার চাক্ষুষ দর্শনের মাধ্যমে উম্মতি মুহাম্মদি অদৃশ্য জ্ঞান ভাণ্ডার লাভ করেছে।

পঞ্চমত: আল্লাহ তাআলা নিজের কুদরত, ওহির সত্যতা বুঝানো এবং প্রমাণ করার জন্য তাকে জান্নাত-জাহান্নাম সহ বহু কিছু দর্শন করিয়েছেন। যেগুলোর ওয়াদা তিনি ওহিতে মুমিন ও কাফের বান্দাদের জন্য দিয়েছেন।

ষষ্ঠত: ভ্রমণ শুরুর আগে চতুর্থবারের মতো তার ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার পবিত্র দিদার লাভের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। যেই দিদার রাসুলুল্লাহ সা. আরশে মুআল্লায় গিয়ে লাভ করেছেন।

সপ্তমত: জান্নাতি পশু বোরাক ভ্রমণের বাহন হিসেবে পাঠিয়ে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার বুকে তার সম্মান আরো বৃদ্ধি করেছেন।

অষ্টমত: বাইতুল মুকাদ্দাসে তার ইমামতি সম্পন্ন করার মাধ্যমে বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রতি প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে টান ও আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন। এটি প্রথম কিবলা হিসেবে এর সুরক্ষায় যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহকে প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

লেখক : শিক্ষক, ওয়ামী মডেল মাদ্রাসা, সফিপুর, কালিয়াকৈর, গাজীপুর 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর