পোশাক আল্লাহর দেওয়া এক মহান নেয়ামত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আদম সন্তানগণ, আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জা নিবারণ করে এবং সৌন্দর্য বর্ধন করে। আর তাকওয়ার পোশাকই উত্তম পোশাক। এগুলো আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্যতম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা আল-আরাফ: ২৬)। ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন পোশাক ও সৌন্দর্যের উপকরণ দিয়ে। পোশাক লজ্জা নিবারণ করে, সৌন্দর্য বর্ধন করে।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর মুসনাদে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি নতুন কাপড় পরে এবং তা তার কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছালে বলে, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে এমন পোশাক পরিয়েছেন যা দিয়ে আমি আমার লজ্জাস্থান আবৃত করি এবং আমার জীবনে তা দিয়ে সৌন্দর্য লাভ করি।’ এরপর সে তার পুরনো কাপড়টি সাদকা করে দেয়, তখন সে ব্যক্তি জীবিত বা মৃত উভয় অবস্থায় আল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণে, নিরাপত্তায় ও দায়িত্বে থাকে।’
পোশাকে মধ্যপন্থা: অপচয়, অহংকার ও শরয়ি বিধান
ইসলামি শরিয়তের পাঁচটি মূল বিধান, ওয়াজিব (ফরজ), মুস্তাহাব, মুবাহ (বৈধ), হারাম এবং মাকরুহ, এগুলো পোশাকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ওয়াজিব পোশাক: পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য সতর ঢাকার মতো পোশাক পরা ওয়াযিব। তবে এই ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে। যেমন, পোশাকটি নাপাক বস্তু দিয়ে তৈরি না হওয়া, পুরুষের জন্য রেশম বা স্বর্ণের তৈরি না হওয়া, এবং এটি যেন কোন কাফির বা পাপাচারী ব্যক্তির পোশাকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ না হয়। পুরুষ নারীর মতো এবং নারী পুরুষের মতো পোশাক পরিধান করাও নিষিদ্ধ।
মুস্তাহাব পোশাক: সালাত আদায়ের সময়, কোরআন তেলাওয়াতের সময়, ঈদ ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য উত্তম পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব।
মাকরূহ পোশাক: বৈধ পোশাকে যদি সামান্য অপচয় হয়, তবে তা মাকরূহ হিসাবে পরিগণিত হবে।
হারাম পোশাক: যদি অহংকার বা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে পোশাক পরা হয়, অথবা পুরুষের পোশাক রেশম বা স্বর্ণ দিয়ে তৈরি হয়, তাহলে তা হারাম হিসাবে বিবেচিত হবে।
ইসলাম পোশাক-পরিচ্ছদে ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয়তা উভয় থেকেই দূরে থাকতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এই বিষয়ে একটি মূলনীতি হলো, হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘খাও, পান করো, পোশাক পরো এবং দান করো, কিন্তু অপচয় ও অহংকার করো না।’ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, ‘তুমি যা খুশি খাও এবং যা খুশি পরো, যতক্ষণ দুটি জিনিস থেকে মুক্ত থাকবে; অপচয় ও অহংকার।’
পোশাকে অপচয়ের বিভিন্ন রূপ
অপ্রয়োজনীয়তা যেমন নিন্দনীয়, তেমনি পোশাকের ক্ষেত্রে অপচয় ও বাড়াবাড়িও মন্দ বিষয়। পোশাকে অপচয়ের কিছু উল্লেখযোগ্য দিক এখানে উল্লেখ করা হল। পুরুষের জন্য রেশম বা স্বর্ণের তৈরি পোশাক পরিধান করা। পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে শরিয়তের অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করা। বৈধ পোশাক পরিধানেও বাড়াবাড়ি করা। যেমন, অতিরিক্ত দামি এবং অপ্রয়োজনীয় পোশাক কেনা।
অবহেলা করে পোশাক নষ্ট করা: পোশাকের যত্ন না নেওয়া এবং সেগুলোকে নষ্ট করে ফেলা। বর্তমানে পোশাকের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা এবং লোকদেখানোর প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। নিত্যনতুন ফ্যাশন, মডেল এবং ট্রেন্ডের কারণে এই অপচয় আরও বহুগুণে বেড়েছে।
পোশাক বিলাসিতায় অন্যকে অনুকরণ: বর্তমান সমাজে ফ্যাশন ও ট্রেন্ডের নামে চলছে নগ্নতা ও বেহায়াপনার অবাধ প্রদর্শনী। শালীনতার তোয়াক্কা না করে এক শ্রেণির মুসলিম তরুণ-তরুণী ও নারী উন্মত্তের মতো ছুটছে এর পেছনে। সামান্যতম বিবেকবোধ কিংবা আত্মসচেতনতার তোয়াক্কা ছাড়াই তারা অপচয় করছে অগাধ অর্থ। তথাকথিত তারকা বা ‘সেলিব্রিটি’দের অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে তারা নিজেদের এমন সব রূপে উপস্থাপন করছে, যা দেখে বিস্ময়ের সীমা থাকে না। অভিনয়, নাচ, খেলাধুলা কিংবা মডেলিংয়ের এই তথাকথিত ‘আদর্শ’রা তাদের বিকৃত পোশাক, অশ্লীল ভঙ্গিমা আর অদ্ভুত আচরণের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা-চেতনা কলুষিত করছে, সমাজকে নামাচ্ছে নৈতিকতার গভীর খাদে। তাদের চালচলন দেখে মনে হয়, এরা মানুষ, নাকি পাগলপ্রায় কোনো সত্তা! কখনো এই দৃশ্য হাসির উদ্রেক করে, কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই লুকিয়ে আছে গভীর বেদনা। আসলে এটি হাসির ছদ্মবেশে কান্নারই এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
বাসস্থান আল্লাহর এক মহান নেয়ামত
পোশাকের মতো বাসস্থানও আল্লাহর এক বিরাট নেয়ামত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আল্লাহ তোমাদের গৃহকে তোমাদের জন্য আবাসস্থল করেছেন এবং পশুর চামড়া দিয়ে তোমাদের জন্য তাঁবুর ব্যবস্থা করেছেন, যা তোমরা ভ্রমণের সময় ও স্থায়ী বসবাসের সময় সহজে বহন করতে পারো।’ (সুরা নাহল-৮০)
ইমাম কুরতুবি (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য ঘরকে বসবাসের স্থান বানিয়েছেন।’ এই আয়াতে আল্লাহ মানুষের প্রতি তাঁর নেয়ামত হিসেবে স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয় ধরনের বাসস্থানের কথাই উল্লেখ করেছেন।
স্থায়ী বাসস্থান: প্রথমত, তিনি শহরের ঘরবাড়িগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন, যা দীর্ঘ সময় বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হয়।
অস্থায়ী বাসস্থান: এরপর তিনি ভ্রমণকালে ব্যবহৃত অস্থায়ী আবাসস্থলের কথা বলেছেন, যা পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি তাঁবু বা খিমার মতো এবং সহজে বহনযোগ্য।
বাসস্থান নির্মাণে মধ্যপন্থা
ইসলাম বাসস্থান নির্মাণে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে উৎসাহিত করে। এটি যেমন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অগ্রহণযোগ্য যে, একজন মানুষ ছোট, জরাজীর্ণ বা অপরিষ্কার স্থানে বাস করবে। তেমনি এটিও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিন্দনীয় যে মানুষ গর্ব ও অহংকারের জন্য বিলাসবহুল ভবন তৈরি করবে এবং তাতে এমন অর্থ ব্যয় করবে যা তাদের অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনে কাজে আসতে পারত।
এ বিষয়ে বেশ কিছু হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, ‘আমি ও আমার বাবা যখন আমাদের একটি দেয়াল মেরামত করছিলাম, তখন রাসুল (সা.) আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবদুল্লাহ, এটা কী?’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এটি একটি দেয়াল যা আমরা মেরামত করছি।’ তখন তিনি বললেন, ‘সময় এর চেয়ে দ্রুত ফুরিয়ে যাবে।’
তবে মাঝারি আকারের বা প্রশস্ত বাড়ি-ঘর তৈরি করা বৈধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের সৌভাগ্যের বিষয় তিনটি: সৎ প্রতিবেশী, আরামদায়ক যানবাহন এবং প্রশস্ত বাসস্থান।’
ইবনে মুফলিহ আল-মাকদিসি (রহ.) বলেন, ‘মানুষের জন্য একটি বাসস্থান থাকা জরুরি। তাই নিজের এবং যাদের ভরণপোষণ তার ওপর ফরজ, তাদের জন্য এটি অর্জন করা আবশ্যক। এটি এমন কাজ যার জন্য মানুষ পুরস্কৃত হয় এবং ছেড়ে দিলে শাস্তি পেতে পারে।’
ইতিহাসের আয়নায় মানবজাতির বাসস্থান প্রবণতা: ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীন ও আধুনিক উভয় যুগেই মানুষ ভবন নির্মাণ ও সৌন্দর্যায়নের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। এটি ছিল তাদের বিলাসিতার একটি লক্ষণ। ইবনে খালদুন (রহ.) বলেন, ‘প্রথম দিকে ইসলাম বাড়াবাড়ি ও অপচয় থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করত। কিন্তু যখন ধর্মের এই প্রভাব কমে গেল এবং বিলাসিতা বৃদ্ধি পেল, তখন মুসলিমরা পারস্য জাতি থেকে ভবন নির্মাণ ও শিল্পকলা গ্রহণ করল। এরপর তারা বিলাসবহুল ভবন ও শিল্পকর্ম নির্মাণ শুরু করে।’
মুসলিম সমাজে বৈপরীত্যের ধারা: বর্তমান মুসলিম সমাজ দুটি পরস্পরবিরোধী ধারার মুখোমুখি।
দারিদ্র্য ও দুর্ভোগের ধারা: কিছু দেশ রয়েছে যেখানে দেখা যায় নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য ও শত্রুর আধিপত্য রয়েছে এবং সেখানে বহু মানুষ গৃহহীন ও দুর্দশাগ্রস্ত।
ধনী ও বিলাসী ধারা: প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশগুলোতে সম্পদশালীরা বাড়িঘর এবং বড় বড় দালান নির্মাণে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তারা এর পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন রিয়াল খরচ করে। এটি তাদের জীবনে মানসিক চাপ ও দুর্দশা বয়ে আনে। খাব্বাব ইবনুল আরাত (রাযি.) বলেন, ‘মুসলিম তার সব ব্যয়ের জন্য পুরস্কৃত হবে, তবে মাটি দিয়ে যা তৈরি করা হয় (ভবন), তার জন্য নয়।’
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া নূরীয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা

