Logo

ইসলাম

ফকিহ সাহাবি মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর জীবন ও কর্ম

Icon

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:২৬

ফকিহ সাহাবি মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর জীবন ও কর্ম

হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর উপনাম আবু আব্দুর রহমান। তিনি খাজরাজ গোত্রের একজন প্রসিদ্ধ আনসারি সাহাবি এবং নিজ গোত্রের শ্রেষ্ঠ যুবক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শারীরিক গঠনে ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন। শুভ্র ও দীপ্তিময় গাত্রবর্ণ, ঝকঝকে দাঁত এবং সুরমাকালো পাপড়ির চোখ তাঁর সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী, প্রখর বুদ্ধিমান, সহনশীল, উদার ও বদান্য চরিত্রের অধিকারী।

ইলম ও ফিকহের জগতে তাঁর মর্যাদা ছিল অতুলনীয়। প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিলয়াতে ইমাম আবু নুআইম (রহ.) তাঁকে ফকিহদের ইমাম এবং উলামায়ে কেরামের জ্ঞানভাণ্ডার বলে আখ্যায়িত করেছেন। দানশীলতায় তিনি ছিলেন অনন্য। দুহাতে খরচ করতেন। আল্লাহর পথে অকাতরে দান-সদকা করতেন।

মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ঐতিহাসিক আকাবার বাইআতে শরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বিশ বছর বয়সে তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং এরপর উহুদসহ প্রায় সব গাজওয়াতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তিনি একজন বিশিষ্ট ফকিহ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত ছিলেন।

হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারিম (সা.) মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) সম্পর্কে বলেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে হালাল ও হারাম সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞান রাখে মুআজ ইবনে জাবাল।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৯০) হজরত মুহাম্মদ ইবনে কাব কুরাজি (রহ.) থেকে (মুরসাল সূত্রে) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন মুআজ ইবনে জাবাল উলামায়ে কেরামের অগ্রভাগে অবস্থান করবে।’ (জামে সগির, হাদিস: ৮১৬৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। নবীজি একদিন তাঁকে বলেন, ‘হে মুআজ! আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-ও জবাব দিলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমিও আপনাকে ভালোবাসি।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৫৩৩)

হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত জাফর ইবনে আবী তালিব (রা.) ও হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেন। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের কথাও উল্লেখ আছে।

তিনি কোরআনুল কারিমের নির্ভরযোগ্য কারি ও গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী আলেম ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেই তিনি অন্যান্য সাহাবির সঙ্গে পবিত্র কোরআন সংকলনের সৌভাগ্য অর্জন করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০০৩) 

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা চারজনের কাছ থেকে কুরআন শিক্ষা করো; আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), উবাই ইবনে কাব (রা.), মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) এবং আবু হুজায়ফা (রা.)-এর মুক্তদাস সালিম (রা.) থেকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮০৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) সময়েই হজরত মুআজ (রা.) একজন নির্ভরযোগ্য মুফতি হিসেবে গণ্য হতেন। মক্কা বিজয়ের পর যখন নবীজি (সা.) হুনায়নের যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন, তখন তিনি মুআজ (রা.) মক্কায় রেখে যান, যাতে তিনি মানুষকে দ্বীন ইসলাম ও কোরআনের শিক্ষা দিতে পারেন। (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস: ৫২৬৯)

পরবর্তীতে তাঁকে ইয়ামানের আল-জান্দ অঞ্চলে দায়ি ও মুবাল্লিগ হিসেবে প্রেরণ করা হয়। তাঁর আন্তরিক দাওয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ তাবলিগের ফলে ইয়ামানের শাসক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ইয়ামানের গভর্নর নিযুক্ত করে পাঠান এবং ইয়ামানবাসীদের উদ্দেশ্যে লিখিত চিঠিতে বলেন, ‘আমি তোমাদের কাছে আমার লোকদের মধ্য থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তিকে পাঠালাম।’

ইয়ামানে প্রেরণের সময় নবীজি (সা.) তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ নসিহত প্রদান করেন। তিনি আদেশ করেন মানুষের জন্য সহজতা অবলম্বন করতে, কঠোরতা আরোপ না করতে, সুসংবাদ দিতে এবং এমন কিছু না বলতে যাতে তারা দ্বীন থেকে বিমুখ হয়। বিচারকার্যে কোরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের নির্দেশ দেন এবং নতুন সমস্যায় ইজতিহাদের অনুমতিও প্রদান করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭৩৩) 

রাসুলুল্লাহ (সা.) ওফাতের সময় হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) ইয়ামানে ছিলেন। পরে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খিলাফতকালে তিনি মদিনায় ফিরে আসেন এবং হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উমর (রা.) তাঁর ফিকহ ও প্রজ্ঞাকে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, একবার বলেছিলেন ‘মুআজ না থাকলে উমর ধ্বংস হয়ে যেত।’ এক ভাষণে হজরত উমর (রা.) ঘোষণা করেন, ‘যে ব্যক্তি দ্বীন ও ফিকহের জ্ঞান অর্জন করতে চায়, সে যেন মুআজ ইবনে জাবাল রাদিআল্লাহু আনহুর নিকট যায়।’

হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) শাম অভিযানে অংশ নেন। সেখানেই ১৮ হিজরিতে ভয়াবহ প্লেগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তিকাল করেন।

হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) বলেন, ইয়ামানের শাসনভার অর্পণ করে বিদায় দেওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তের দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। আমি বাহনে আরোহী আর নবীজি (সা.) পায়ে হেঁটে আমার পাশে পাশে চলছিলেন। পথ চলতে চলতে তিনি এমন এক কথা বললেন, যা আমার হৃদয়কে ভারী করে তুলল। তিনি ইরশাদ করলেন, ‘সম্ভবত এ বছরের পর আমাদের আর দেখা হবে না।’

এই বাক্য শুনতেই বিচ্ছেদের আশঙ্কায় আমার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। বিদায়ের বেদনায় আমি নিজেকে আর সংবরণ করতে পারলাম না। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর চেহারা মোবারক মদিনার দিকে ফিরিয়ে বললেন, ‘আমার ইন্তেকালের পর যে ব্যক্তি আল্লাহভীতিতে সবচেয়ে অগ্রগামী হবে, সেই হবে আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী। সে ব্যক্তি কে এবং কোথায় অবস্থান করছে এটা কোনো বিবেচ্য বিষয় না।’ এরপর অশ্রুসিক্ত নয়নে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বিদায় জানালাম। (সুনানে বাইহাকি: ৯/২২)

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

মাদরাসা শিক্ষা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর