Logo

ইসলাম

জান্নাতের সৌন্দর্য ও চিরন্তন শান্তির আবাস : ঈমানদারদের চূড়ান্ত গন্তব্য

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:২১

জান্নাতের সৌন্দর্য ও চিরন্তন শান্তির আবাস : ঈমানদারদের চূড়ান্ত গন্তব্য

মানুষের হৃদয়ে সবচেয়ে গভীর আকাক্সক্ষাগুলোর একটি হলো শান্তি, নিরাপত্তা ও পরিপূর্ণ সুখ। দুনিয়ার জীবনে এই চাওয়াগুলো কখনোই পুরোপুরি পূর্ণ হয় না। সুখের মাঝেও দুঃখ থাকে, স্বাচ্ছন্দ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অস্থিরতা। এই সীমাবদ্ধ জীবনের বিপরীতে ইসলাম মানুষের সামনে যে চূড়ান্ত গন্তব্যের ছবি তুলে ধরে, তা হলো জান্নাত- যেখানে নেই দুঃখ, নেই ক্লান্তি, নেই ভয়; আছে কেবল অনন্ত প্রশান্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। পবিত্র কোরআনে জান্নাতকে এমন এক আবাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যা মানুষের কল্পনারও ঊর্ধ্বে। আল্লাহ তায়ালা বলেন“কেউ জানে না তাদের জন্য কী কী নয়নপ্রিয় প্রতিদান গোপন রাখা হয়েছে- তারা যা করত তার পুরস্কারস্বরূপ।”(সূরা সাজদাহ: ১৭)

প্রাকৃতিক দৃশ্যের অপার সৌন্দর্য

জান্নাতের অন্যতম আকর্ষণ তার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কোরআনে বারবার জান্নাতকে বাগান, নদী, ছায়া ও সবুজে ঘেরা এক শান্তিময় ভূমি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। “তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত।” (সূরা মুহাম্মদ: ১২) এই নদীগুলো কোনো দূষণ বা দুর্গন্ধে ভরা নয়; বরং দুধ, মধু, স্বচ্ছ পানি ও সুস্বাদু পানীয়ের প্রবাহে পরিপূর্ণ। জান্নাতের বাতাস øিগ্ধ, আলো কোমল, আর পরিবেশ হবে এমন প্রশান্ত—যেখানে হৃদয় কখনো ক্লান্ত হবে না।

অপূর্ব ঘরবাড়ি ও আরাম

জান্নাতের বাসস্থান হবে অতুলনীয়। সেখানে থাকবে সুউচ্চ প্রাসাদ, মুক্তা ও সোনায় নির্মিত ঘর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “জান্নাতে একটি ঘরের ইট হবে সোনা ও রূপার।” (সহীহ বুখারি: ৩২৫৪) এই ঘরগুলোতে থাকবে সুসজ্জিত আসন, নরম বিছানা এবং এমন আরাম, যা দুনিয়ার কোনো বিলাসিতার সঙ্গে তুলনীয় নয়। সেখানে বসে মুমিনরা একে অপরের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপে মগ্ন থাকবে।

খাদ্য ও পানীয়ের চিরন্তন আনন্দ

দুনিয়ায় খাদ্য মানুষের প্রয়োজন; জান্নাতে তা হবে আনন্দ ও সম্মানের প্রতীক। সেখানে থাকবে পছন্দের সব ফল, যেগুলো কখনো শেষ হবে না। “তাদের জন্য থাকবে প্রচুর ফলমূল- যা তারা চাইবে।”(সূরা ওয়াকিয়া: ২০–২১) জান্নাতের পানীয় হবে বিশুদ্ধ, নেশামুক্ত ও আনন্দদায়ক। কোরআনে বলা হয়েছে- “তাদেরকে পান করানো হবে পবিত্র পানীয়।”(সূরা দাহর: ২১)

অন্তরের শান্তি ও নিরাপত্তা

জান্নাতের সৌন্দর্য শুধু দৃশ্যমান নয়; এর প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত মানুষের অন্তরের প্রশান্তিতে। সেখানে থাকবে না হিংসা, বিদ্বেষ বা দুঃখের কোনো ছায়া। “আমি তাদের অন্তর থেকে বিদ্বেষ দূর করে দেব।”(সূরা আল-আরাফ : ৪৩) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “জান্নাতবাসীরা কখনো মৃত্যুবরণ করবে না, অসুস্থ হবে না এবং তাদের যৌবন কখনো শেষ হবে না।”(সহীহ মুসলিম : ২৮৩৬)

আল্লাহর সন্তুষ্টি- সবচেয়ে বড় নেয়ামত

সব নেয়ামতের ঊর্ধ্বে জান্নাতের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দিদার। “আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে- এটাই মহাসাফল্য।”(সুরা তাওবা: ৭২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: “আল্লাহ জান্নাতবাসীদের জিজ্ঞেস করবেন, ‘তোমরা কি সন্তুষ্ট?’ তারা বলবে, ‘হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এমন কী দিয়েছেন, যা কাউকে দেননি।’ তখন আল্লাহ বলবেন, ‘আমি তোমাদের ওপর আমার সন্তুষ্টি নাজিল করছি; এরপর আর কখনো তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হব না।” (সহীহ বুখারি : ৬৫৩৬; সহীহ মুসলিম: ২৮৩৭)

পরিশেষে বলতে চাই, জান্নাত কোনো রূপক কল্পনা নয়; এটি ঈমানদারদের জন্য প্রতিশ্রæত চূড়ান্ত সত্য। দুনিয়ার জীবনের প্রতিটি সংযম, প্রতিটি সৎকর্ম এবং প্রতিটি ধৈর্যপূর্ণ মুহূর্ত জান্নাতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একেকটি ধাপ। জান্নাতের মনোরম দৃশ্য আমাদের শুধু আনন্দ দেয় না, বরং দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে—যাতে আমরা এমন জীবন যাপন করি, যা আমাদের সেই চিরশান্তির আবাসের যোগ্য করে তোলে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদে পৌঁছানোর তাওফীক দান করুন, আমিন।

লেখক : লেখক ও ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার


প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর