Logo

ইসলাম

হিংসা : অন্তরের নীরব আগুন ও ঈমান বিধ্বংসী ব্যাধি

Icon

মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৯

হিংসা : অন্তরের নীরব আগুন ও ঈমান বিধ্বংসী ব্যাধি

মানুষের নিকট তার অন্তর একটি মূল্যবান আমানত। এই অন্তরেই জন্ম নেয় ঈমান, তাকওয়া, ভালোবাসা ও মানবিকতার মতো মহৎ গুণ; আবার এখানেই লুকিয়ে থাকে কিছু ভয়ংকর ব্যাধি, যা নীরবে মানুষের নেক আমল ধ্বংস করে দেয় এবং সমাজে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এসব আত্মিক রোগের মধ্যে অন্যতম ভয়ংকর একটি রোগ হলো হাসাদ বা হিংসা। বাহ্যিকভাবে এটি অদৃশ্য থাকে, কিন্তু এর ক্ষতি অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। অন্যের কল্যাণ সহ্য করতে না পারা, আল্লাহর বণ্টনের ওপর অসন্তুষ্টি, এসব কিছুই হিংসাকে একটি মারাত্মক আত্মঘাতী ব্যাধিতে পরিণত করে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে হিংসার ভয়াবহতা, এর ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষতি এবং তা থেকে বাঁচার পথ সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য।

হাসাদ বা হিংসার অর্থ

‘হাসাদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘জ্বলে যাওয়া’। শরীয়তের পরিভাষায়, অন্যের ওপর আল্লাহ প্রদত্ত কোনো নিয়ামত দেখে অন্তরে জ্বালা অনুভব করা এবং ওই নিয়ামতটি তার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হোক বা ধ্বংস হয়ে যাক, এমন আকাক্সক্ষা করাকে হিংসা বলে। আদতে, হিংসা হলো আল্লাহ তাআলার বণ্টনের ওপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা।

পবিত্র কোরআনের আলোকে হিংসা

হিংসার ভয়াবহতা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ৫৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন, “তবে কি তারা মানুষের প্রতি হিংসা করে এজন্য যে, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের যা দিয়েছেন (তার জন্য)। আমি তো ইবরাহিমের বংশধরদের কিতাব ও হিকমত দান করেছি এবং দান করেছি তাদেরকে বিশাল সাম্রাজ্য।”

হিংসা নেক আমলকে ধ্বংস করে দেয়

হাদিসে নববিতে হিংসার পরিণাম সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। রাসুলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, “তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো! কেননা হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন শুকনো কাঠকে ভস্মীভূত করে দেয়।” (সুনানে আবু দাউদ-৪৯০৩)

এই হাদিস থেকে পরিষ্কার হয় যে, হিংসুক ব্যক্তি দুনিয়াতে যেমন অশান্তিতে জ্বলে, আখেরাতেও তার উপার্জিত নেক আমলগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) কর্তৃক বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, কোন মুমিন বান্দার পেটে আল্লাহর রাস্তার ধুলো এবং জাহান্নামের অগ্নিশিখা একত্রে জমা হতে পারে না এবং কোন বান্দার পেটে ঈমান ও হিংসা একত্রে জমা হতে পারে না। (মুসনাদে আহমাদ ২/৩৪০)

হিংসার কারণসমূহ

হিংসার কারণগুলোকে মৌলিকভাবে তিন ভাগে ভাগ করা যায়, হিংসুকের পক্ষ থেকে সৃষ্ট কারণ। যার ব্যাপারে হিংসা করা হয় তার থেকে উদ্ভুত কারণ। উভয়ের সম্মিলিত কারণ। হিংসুকের পক্ষ থেকে সৃষ্ট কারণ শত্রুতা, বিদ্বেষ ও অন্তরের ঘৃণা। কারো প্রতি আক্রোশ ও হিংস্র মনোভাব হিংসা তৈরি করে। অহংকার ও আত্মঅহমিকা। নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবতে থাকা। নেতৃত্ব ও সম্মানের লালসা। এমন ইচ্ছা লালন করা যে, সব মর্যাদা কেবল নিজেরই থাকুক। দুনিয়ার প্রতি অতিমাত্রায় ভালোবাসা। ক্ষমতা, সম্পদ ও খ্যাতিকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানানো। অতিরিক্ত মেলামেশা ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বিশেষত প্রতিবেশী, সহকর্মী ও আত্মীয়দের মধ্যে বেশী মেলামেশা হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

হিংসার ভয়াবহ ক্ষতিসমূহ

হিংসা কেবল ব্যক্তিগত পাপ নয়; এটি ব্যক্তি, সমাজ ও দ্বীনের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। নিম্নে এর কিছু উল্লেখ করা হলো

এটা দ্বীন ধ্বংসকারী ব্যাধি: রাসুল (সা.) বলেন: “তোমাদের মধ্যে পূর্ববর্তী জাতিগুলোর রোগ ঢুকে পড়েছে, হিংসা ও বিদ্বেষ। এটি মুণ্ডনকারী; আমি বলছি না চুল মুণ্ডন করে, বরং দ্বীনকে মুণ্ডন করে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১০)

হিংসার কারণে পূর্ণ ঈমান ধ্বংস হয়ে যায়: হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) কর্তৃক বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, কোন মুমিন বান্দার পেটে আল্লাহর রাস্তার ধুলো এবং জাহান্নামের অগ্নিশিখা একত্রে জমা হতে পারে না এবং কোন বান্দার পেটে ঈমান ও হিংসা একত্রে জমা হতে পারে না। (মুসনাদে আহমাদ ২/৩৪০) 

হিংসার কারণে সমাজ থেকে কল্যাণ উঠে যায়। নবি (সা.) বলেছেন, “মানুষেরা ততদিন পর্যন্ত কল্যাণের সাথে থাকবে, যতদিন পর্যন্ত তারা পরস্পরে হিংসায় লিপ্ত না হবে।” (মুজামুল কাবির, তাবারানি-৮১৫৬))

হিংসার কারণে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নেমে আসে ও নেক আমল ধ্বংস হয়ে যায়। রাসুলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, “তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো! কেননা হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন শুকনো কাঠকে ভস্মীভূত করে দেয়।” (সুনানে আবু দাউদ-৪৯০৩)

হিংসার কারণে মানুষের মাঝে ঘৃণা তৈরি হয় ও সৃষ্টি হয় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। বর্ণিত আছে “সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে, যে মানুষকে ঘৃণা করে এবং মানুষও তাকে ঘৃণা করে।” (সুনানে আবু দাউদ: ১৪৮৫)

হিংসার কারণে মিথ্যা, গিবত ও অপবাদে লিপ্ত হতে হয়: হিংসুক ব্যক্তি নিজের অজান্তেই হারাম কথাবার্তা ও চরিত্রহননের পথে পা বাড়ায়। হিংসুকের মোকাবিলায় যার ওপর হিংসা করা হয় তার করণীয় ইসলাম আমাদের প্রতিশোধ নয়; বরং তাকওয়া ও ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। তাই যার উপর হিংসা করা হচ্ছে তার জন্য কর্তব্য হলো। আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন ও তাওবা করা। আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করা। নিয়মিত যিকির ও মাসনুন দুআ সমূহ গুরুত্বের সাথে পাঠ করা। হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা। ন্যায়বিচার বজায় রাখা ও পাল্টা ক্ষতি না করা। সম্ভব হলে হিংসুকের প্রতি সদাচরণ করা। শরয়ি রুকইয়াহ গ্রহণ। নিজের নিয়ামতের কথা হিংসুকের কাছে প্রকাশ না করা। 

যদি কেউ (আল্লাহ না করুন) হিংসায় আক্রান্ত হয়ে যায় তাহলে তার করণীয় হলো :

তাকওয়া ও ধৈর্য অবলম্বন। অন্তরের বিদ্বেষ দূর করার চেষ্টা। স্মরণ রাখা যে, হাসাদ দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষতিকর ডেকে আনে।

যার প্রতি হিংসা হয় তার প্রশংসা ও কল্যাণ কামনা করা। বেশি বেশি মানুষকে সালামের দেয়া। অহংকার ও আত্মমর্যাদার কৃত্রিম গর্ব দমন। নিয়ত বিশুদ্ধ করা। নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করা। কিয়ামত ও হিসাবের ভয় স্মরণ রাখা। দুআ ও সদকা করতে থাকা। হিংসা প্রথম গুনাহ যা আসমানে সংঘটিত হয়েছিল (শুয়াবুল ঈমান, ৬২০৮)। তাই আমাদের উচিত অন্যের সুখে সুখী হওয়া এবং আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই আত্মঘাতী ব্যাধি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

শিক্ষক : জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা। 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

মাদরাসা শিক্ষা ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর