Logo

ইসলাম

বিপদের মুখে ধৈর্য ও আল্লাহভীতি : মুমিন জীবনের প্রকৃত শক্তি

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৩৫

বিপদের মুখে ধৈর্য ও আল্লাহভীতি : মুমিন জীবনের প্রকৃত শক্তি

মানুষের জীবন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরা হলেও দুঃখ, বিপদ ও সংকট তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অসুস্থতা, দারিদ্র্য, পারিবারিক অশান্তি, প্রিয়জন হারানোর বেদনা কিংবা মানসিক হতাশা- এসব পরিস্থিতিতে মানুষ প্রায়ই দিশেহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য এসব বিপদ শুধু কষ্টের নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগও হয়ে থাকে। কোরআন ও হাদিসে বারবার বলা হয়েছে- ধৈর্য (সবর) ও আল্লাহভীতি (তাকওয়া) হলো মুমিন জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

ধৈর্যের অর্থ ও গুরুত্ব

ধৈর্য মানে কেবল কষ্ট সহ্য করে নীরব থাকা নয়। এটি হলো আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, গুনাহ থেকে নিজেকে সংযত রাখা এবং বিপদের সময়ও অবিচল থাকা। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-“হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সুরা আল-বাকারা: ১৫৩) এই আয়াত স্পষ্টভাবে বলে- বিপদের সময় ধৈর্য ও নামাজই হলো মুমিনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। ধৈর্য শুধু বিপদে সহ্য করার নাম নয়; বরং তা মুমিনের আত্মিক শক্তি, যা তাকে আল্লাহর নিকট নিকটে রাখে।

বিপদ আল্লাহর পরীক্ষা

মানুষ প্রায়ই বিপদে পড়ে মনে করে আল্লাহ হয়তো তার প্রতি অসন্তুষ্ট। কিন্তু কোরআন আমাদের শিক্ষা দেয়-বিপদ আসা মানেই শাস্তি নয়; বরং এটি আল্লাহর পরীক্ষা। আল্লাহ তায়ালা বলেন- “আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।” (সুরা আল-বাকারা: ১৫৫) অর্থাৎ, বিপদ একটি পরীক্ষা এবং ধৈর্যশীলতা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মূল চাবিকাঠি। বিপদ কখনোই বৃথা যায় না; বরং ধৈর্যশীল ব্যক্তি আল্লাহর রহমতে আরো শক্তিশালী হয়। ধৈর্যের প্রতিদান সম্পর্কে হাদিস রাসুলুল্লাহ (সা.) ধৈর্যের ফজিলত সম্পর্কে বলেছেন, “মুমিনের ওপর যে কষ্ট, রোগ, দুঃখ, চিন্তা এমনকি কাঁটা বিঁধে-সব কিছুর মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন।” (সহীহ বুখারি: ৫৬৪১, সহীহ মুসলিম: ২৫৭৩)

এটি আমাদের জন্য একটি আশ্বাস যে, একজন মুমিনের কষ্ট কখনোই বৃথা যায় না। আল্লাহ প্রতিটি বিপদকে মুমিনের জন্য পুণ্য ও পরিশুদ্ধির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেন। আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যাকে আল্লাহ কল্যাণ দান করতে চান, তাকে তিনি বিপদে ফেলেন।”(সহীহ বুখারি: ৫৬৪৫) এই হাদিস আমাদের শেখায়, বিপদ ও কষ্টের মধ্যে অনেক সময় আল্লাহর রহমতের রহস্য লুকিয়ে থাকে।

তাকওয়া : আল্লাহভীতির শক্তি

তাকওয়া হলো- প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহকে ভয় করে জীবন পরিচালনা করা। এটি শুধু নামাজ, রোজা বা ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কথা বলা, লেনদেন, পারিবারিক দায়িত্ব পালন- সবক্ষেত্রেই আল্লাহর বিধান মেনে চলাই তাকওয়া। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- “যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।” (সুরা আত-তালাক: ২-৩) এটি স্পষ্টভাবে দেখায়-আল্লাহভীতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাহায্য ও রক্ষা প্রদান করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন- “যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো (তাকওয়া অবলম্বন করো)।”(জামে তিরমিজি: ১৯৮৭) এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর হাদিসটি আমাদের নির্দেশ দেয়, যে আল্লাহভীতি মুমিনের জন্য সার্বিক নিরাপত্তা ও শান্তির মূল।

রাসুল (সা.)-এর জীবনে ধৈর্যের উদাহরণ

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ধৈর্যের জীবন্ত উদাহরণ। মক্কার কাফিরদের অত্যাচার, প্রিয়জনদের মৃত্যু, তায়েফে দাওয়াত দিতে গিয়ে পাথর নিক্ষেপ- সবকিছু তিনি ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেছেন। বিশেষ করে তায়েফে আহত অবস্থায় ফেরেশতা পাহাড় ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি বলেন- “আমি চাই না তারা ধ্বংস হোক; বরং আশা করি তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ হবে যারা আল্লাহর ইবাদত করবে।”(সহীহ বুখারি: ৩২৩১) এটি ধৈর্য, ক্ষমা ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত।

ধৈর্যশীলদের অগণিত পুরস্কার

কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- “নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের প্রতিদান দেওয়া হবে হিসাব ছাড়াই।”(সুরা আয-যুমার: ১০) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন-“মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক। তার সব অবস্থাই কল্যাণকর। সুখে কৃতজ্ঞ হলে তা কল্যাণ, আর দুঃখে ধৈর্য ধরলে তাও তার জন্য কল্যাণ।”(সহীহ মুসলিম: ২৯৯৯)

দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ

আজকের ব্যস্ত ও প্রতিযোগিতামূলক জীবনে মানুষ অল্প কষ্টেই হতাশ হয়ে পড়ে। আর্থিক চাপ, পারিবারিক টানাপোড়েন, সামাজিক প্রতিযোগিতা-সবই মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে। এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও তাকওয়া মানুষকে আত্মিক শান্তি দেয়, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে এবং বিপদ মোকাবিলার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।উদাহরণস্বরূপ, একজন নারী বা পুরুষ কর্মজীবী যদি চাকরি হারায় বা পরিবারের কারোর অসুস্থতার সম্মুখীন হয়, সে ধৈর্য ধরলে এবং আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখলে মানসিক শান্তি বজায় থাকে। নামাজ, কোরআন পাঠ, দোয়া এবং ইস্তেগফার এসব অভ্যাস তাকে স্থিতিশীল রাখে।

পরিশেষে বলতে চাই, ধৈর্য ও তাকওয়া কোনো দুর্বলতার নাম নয়; বরং এগুলো মুমিনের প্রকৃত শক্তি। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে ধৈর্য ধারণ করে এবং তাকওয়ার সঙ্গে জীবন পরিচালনা করে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাত- উভয় জগতে সম্মানিত করেন। বিপদ সাময়িক, কিন্তু ধৈর্যের প্রতিদান চিরস্থায়ী। আল্লাহর আশ্রয়, নামাজ ও ধৈর্যশীলতা মুমিনকে প্রতিটি বিপদে রক্ষা করে এবং আত্মিক শান্তি প্রদান করে।

লেখক : ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম মাদরাসা শিক্ষা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর