মিরাজ : ঊর্ধ্বলোকের মহাযাত্রা ও মর্ত্যের মানুষের পাথেয়
হাফেজ মুফতী রাশেদুর রহমান
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪১
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নবুওয়াতী জীবনের বিস্ময়কর ও অনন্য এক অধ্যায় হলো ‘মিরাজ’। ‘মিরাজ’ শব্দের সাথে-ই জড়িয়ে আছে ‘ইসরা’ শব্দ। ‘ইসরা’ অর্থ রাতে ভ্রমণ করানো। ইসলামের ইতিহাসে ‘ইসরা’ হলো সেই রাতের ভ্রমণ, যা পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছিল। আর ‘মিরাজ’ হলো সেই ঊর্ধ্বগমন, যা বায়তুল মা কদিস থেকে শুরু করে মহান আল্লাহর আরশে আজিমের কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছেছিল। নবীজির (সা.) এই অলৌকিক সফরে কিয়ামত পর্যন্ত আসা প্রতিটি মানুষের জন্য রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ও সমাজ সংস্কারের দর্শন।
আত্মশুদ্ধি ও নেতৃত্বের গুণাবলি
মিরাজের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো, নেতৃত্বের আসনে বসার আগে নিজেকে পুত-পবিত্র করে তোলা। মিরাজ গমনের প্রাক্কালে জিবরাঈল (আ.) কর্তৃক নবীজির বক্ষ বিদারণ ও হৃদয়ের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা আমাদের সেই বার্তাই দেয়। কলুষমুক্ত চরিত্র আর নির্মল আত্মাই হলো সমাজ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি।
নামাজের মাধুর্য ও আল্লাহর নৈকট্য
মিরাজের রাতে উম্মতের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক মিরাজ। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মাধ্যমেই একজন মানুষ মহান আল্লাহর দিদার ও নৈকট্য লাভে সচেষ্ট হতে পারে। তাই নামাজে অবহেলা করার কোনো অবকাশ নেই।
শুভ্র জীবন ও মাদকতামুক্ত সমাজ
মিরাজের রাতে নবীজিকে পানীয় হিসেবে দুধ ও মদ পেশ করা হলে তিনি দুধ গ্রহণ করেছিলেন। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শুভ্রতা ও সুস্থ স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে। আজকের সমাজকে নেশা ও মাদকতার মরণ ছোবল থেকে মুক্ত করতে হলে মিরাজের এই শিক্ষার বাস্তবায়ন জরুরি।
অটল বিশ্বাস ও সিদ্দিকে আকবরের আদর্শ
মিরাজ যুক্তির চেয়েও বেশি বিশ্বাসের বিষয়। ইসলামের ইতিহাসে হযরত আবু বকর (রা.)-এর ভূমিকা আমাদের সেই দিশাই দেয়। নবীজির (সা.) মুখে মিরাজের কথা শোনা মাত্রই কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তিনি তা বিশ্বাস করেছিলেন। বর্তমান সময়ের বহুমুখী বিভ্রান্তির হাত থেকে বাঁচতে হলে কোরআন ও সুন্নাহর বিধান পালনে আমাদের এমন দৃঢ় প্রত্যয়ী হতে হবে।
ধৈর্য ও আল্লাহর কুদরতে আস্থা
বিপদে বিচলিত না হয়ে মনে-প্রাণে বিশ্বাস রাখা উচিত যে, ‘মেঘের আড়ালে সূর্য হাসে’। ইসলামের অগ্রযাত্রা কেবল সম্পদ বা রাজনীতির প্রভাবে হয়নি; বরং তা হয়েছে আল্লাহর বিশেষ কুদরতে। ওহী নাযিলের প্রথম দিনেই ‘রব’ (যিনি সৃষ্টি করেন ও সব কাজকে পূর্ণতা দান করেন) শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে মহান আল্লাহ সেই ঘোষণা দিয়েছিলেন।
স্রষ্টার অসীমতা ও বিজ্ঞান
আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের স্রষ্টা স্বয়ং আল্লাহ। বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কুদরতের কোনো সীমা নেই। মিরাজ আমাদের যুক্তির ঊর্ধ্বে মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রতি অনুগত হতে শেখায়।
কিছু জরুরি স্পষ্টীকরণ
তারিখ অজ্ঞাত : মিরাজ ঠিক কত তারিখে হয়েছিল, তা অকাট্য বা বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়। তবে তারিখ সুনির্দিষ্ট না হলেও ঘটনাটি ধ্রæব সত্য। যেমন কোনো প্রবীণ মানুষ তার সঠিক জন্ম তারিখ বলতে না পারলেও তার জন্মের বাস্তবতা অনস্বীকার্য।
বিশেষ ইবাদত ও রোজা : মিরাজের রাতে শরিয়ত নির্ধারিত বিশেষ কোনো ইবাদত বা পরবর্তী দিনে বিশেষ কোনো রোজার বিধান নেই। কেউ চাইলে এই রাতে জীবনের কাজা নামাজগুলো আদায় করতে পারেন।
বিদআত বর্জন : কোরআন, হাদিস ও সাহাবীদের চরিত্রে যার প্রমাণ নেই, সওয়াবের আশায় ধর্মের নামে এমন নতুন কিছু উদ্ভাবন করাই হলো বিদআত। যা সর্বদা পরিত্যাজ্য। মিরাজ মূলত আকিদা বা বিশ্বাসের বিষয়, এটি আমল সংক্রান্ত কোনো প্রথা নয়।
কোরআনের অনুসরণ : মিরাজের প্রকৃত শিক্ষা ধারণ করতে হলে পুরো কোরআন, বিশেষ করে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত এবং সূরা বনী ইসরায়েলের ২২ থেকে ৩৮ নম্বর আয়াতের বিধানগুলো ব্যক্তিজীবনে ধারণ করা অপরিহার্য।
নবীজির (সা.)- এর মিরাজ মূলত অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে যাত্রার এক মহাজাগতিক ইশারা। এই ঊর্ধ্বগমনের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এর শিক্ষা ও শুদ্ধিগুলো ধারণ করতে পারব। মেঘের আড়ালের সেই হাসিমাখা সূর্যের সন্ধানেই কাটুক একজন মুমিনের প্রতিটি মুহূর্ত। লুণ্ঠনকারী ও দখলদার ইহুদিদের হাত থেকে পবিত্র বাইতুল মাকদিসকে আজাদ করা হোক আমাদের চিরন্তন অঙ্গীকার।
লেখক : সিনিয়র পেশ ইমাম, বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদ ঢাকা

