এলপি গ্যাসের সংকট : ইসলামে ন্যায় ও সতর্কতা
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:১৩
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে এবং বিশ্বের অনেক দেশে এলপি গ্যাসের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু চাহিদা ও সরবরাহের বাস্তব পরিস্থিতিই নয়, কখনও কখনও বিক্রেতারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দামের ওপর প্রভাব ফেলছেন। এটি সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য একটি বড় চাপ তৈরি করছে। ইসলাম সামাজিক ন্যায়, মানুষের অধিকার ও মিতব্যয়ী ব্যবহারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এ ধরনের কৃত্রিম সংকট এবং অযথা দামের ঊর্ধ্বগতি ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কঠোরভাবে সমালোচিত।
কৃত্রিম সংকট ও প্রতারণা
কোনো পণ্য বা পরিষেবার চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যকে ভেঙে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়াকে ইসলামে প্রতারণা ও অসাধু চর্চা হিসেবে দেখা হয়। কোরআনে আল্লাহ বলেন:“ও যারা ব্যবসা করে, যখন তারা মাপ নেওয়ার সময় থাকে তারা কমিয়ে দেয়, আর যারা তাদের জন্য পরিমাপ করে, তা বৃদ্ধি করে। তারা কি জানে যে, তারা পুনরায় প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাবে?” (সূরা আল-মুতাফফিফিন, ৮৩:১-৩)
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মাপ ও ওজনে ফাঁকফোকর বা অন্যায় লেনদেনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এলপি গ্যাসের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো ঠিক এই ধরনের প্রতারণার সঙ্গে সম্পর্কিত।
মানুষের অধিকার ও ন্যায়
ইসলাম শিক্ষায় মানুষ একে অপরের অধিকার রক্ষা করতে বাধ্য। অর্থনৈতিক চক্রান্ত বা বাজারে মনিপুলেশন মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেন: “যে মানুষ অন্যের অধিকার হরণ করবে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করবেন।” (সহীহ মুসলিম: ৯৬৪) এখানে স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে যে, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দামের ওপর কৃত্রিম চাপ প্রয়োগ করা অন্যের অধিকার হরণ। এটি সরাসরি ন্যায়বিচারের বিরোধী।
সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব
কৃত্রিম সংকট শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক অনৈতিকতা এবং অসদাচরণের প্রতিফলন। যখন সাধারণ মানুষ মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন গ্যাস কিনতে পারবে না, তখন পরিবার, নার্সারি, ছোট ব্যবসা ও রান্নাঘরের দৈনন্দিন জীবন প্রভাবিত হয়। ইসলামে এ ধরনের অসদাচরণ সামাজিক ব্যাধি হিসেবে গণ্য। হাদিসে এসেছে, “একজন সৎ ব্যবসায়ী যা বিক্রি করে, সে আল্লাহর কাছে আশীর্বাদ পায়। (সহীহ বুখারি: ২০৭২)
অর্থাৎ, ব্যবসায়ীর জন্য সৎ ও ন্যায্য হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ব্যক্তিগত স্বার্থে অন্যকে ক্ষতি করা ইসলামের শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক।
মিতব্যয়ী ব্যবহার ও দায়িত্ব
ইসলামে মিতব্যয়ী ব্যবহার এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাহিদা না করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে:“আর খরচ করো, কিন্তু অতিপরিমাণে নয়। নিশ্চয়ই তিনি অতিমিতব্যয়ীদের ভালোবাসেন না।”(সূরা আল-আনআম:১৪১) এটি শুধু ব্যক্তিগত জীবনের জন্য নয়, সামাজিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এলপি গ্যাসের ক্ষেত্রে যদি মানুষ এবং ব্যবসায়ী উভয়ই মিতব্যয়ী হন, অতিরিক্ত চাহিদা ও কৃত্রিম সংকটের সুযোগও কমে যাবে।
ইসলামিক সমাধান ও সতর্কতা
১. সততা ও ন্যায়বিচার বজায় রাখা : ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বৃদ্ধি করার সময় সৎ ও ন্যায্যভাবে আচরণ করবে।
২. সরকারি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ : স্থানীয় প্রশাসন এবং বাজার তদারকি সংস্থা কৃত্রিম সংকট এবং ওভারচার্জ প্রতিরোধ করবে।
৩. মিতব্যয়ী ব্যবহার : পরিবার এবং প্রতিষ্ঠান দৈনন্দিন ব্যবহারে এলপি গ্যাসের অপচয় কমাবে।
৪. সচেতনতা ও শিক্ষণ : মানুষকে জানানো যে অতিরিক্ত মুনাফা ও অসদাচরণ আল্লাহর দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।
ইসলাম আমাদের শুধুমাত্র ধর্মীয় দায়িত্বের কথা মনে করায় না, বরং সামাজিক ন্যায় ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতিও দৃষ্টি দেয়। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা, মূল্যমান বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেওয়া ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে কখনোই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পরিশেষে বলতে চাই, এলপি গ্যাসের কৃত্রিম সংকট শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বেরও একটি পরীক্ষা। কোরআন ও হাদিস আমাদের সতর্ক করে যে, প্রতারণা, অসদাচরণ এবং অন্যের অধিকার হরণ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম সততা, ন্যায়বিচার, মিতব্যয়ী ব্যবহার ও সামাজিক সেবা প্রাধান্য দেয়। তাই ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী উভয়েরই উচিত ন্যায়বিচার বজায় রাখা, যাতে সমাজে শান্তি, সমৃদ্ধি ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
লেখক : ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

