জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী আব্দুর রহমান (রা.)-এর জীবন ও কর্ম
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ
প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৬
হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অতি ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের একজন এবং দুনিয়াতেই একই মজলিশে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সেই ঐতিহাসিক দশজন সাহাবির অন্যতম। তিনি মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরায়শ গোত্রের বনু কিলাব শাখার সন্তান ছিলেন।
জন্ম ও বংশ : ঐতিহাসিকদের মতে ‘আমুল ফিল’ তথা আবরাহার হস্তিবাহিনী দ্বারা মক্কা আক্রমণের প্রায় দশ বছর পর, আনুমানিক ৫৭৮ খ্রিষ্টাব্দে কুরায়শ গোত্রের কিলাব শাখায় তাঁর জন্ম। তাঁর উপনাম আবু মুহাম্মদ। পিতার নাম আওফ এবং মাতার নাম শাফ্ফা। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাঁর নাম ছিল আবদুল কাব। হিদায়াতের আলোয় আলোকিত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন আবদুর রহমান।
ইসলাম গ্রহণ : ইসলামের দাওয়াতের একেবারে সূচনালগ্নেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তখনো দারুল আরকাম আনুষ্ঠানিকভাবে দাওয়াতের কেন্দ্ররূপে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়নি। আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের সময় তাঁর বয়স ত্রিশের কোঠা অতিক্রম করেছিল। তিনি সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী আটজন সাহাবির অন্যতম।
হিজরত : ইসলাম গ্রহণের পর মুশরিকদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি প্রথম হাবশা হিজরতে শরিক হন। পরবর্তীতে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং শেষে মদিনায় হিজরত করেন। এভাবে তিনি দুটি হিজরতের সৌভাগ্য অর্জন করেন। মদিনায় পৌঁছানোর পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সঙ্গে আনসারি সাহাবি হজরত সাদ ইবনে রাবি (রা.)-এর ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন। সাদ ইবনে রাবি ছিলেন মদিনার অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি। তিনি অকপটে আব্দুর রহমান (রা.)-কে তাঁর সম্পদের অর্ধেক গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু আব্দুর রহমান (রা.) বিনয়ের সঙ্গে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবার ও সম্পদে বরকত দান করুন। আমাকে শুধু বাজারের পথ দেখিয়ে দিন।’
ব্যবসায়িক দক্ষতা : তাঁকে বনু কায়নুকার বাজার দেখিয়ে দেওয়া হলে তিনি সেখানেই ব্যবসা শুরু করেন। আল্লাহ তাআলার অশেষ বরকতে প্রথম দিনেই তিনি লাভবান হন এবং সেই লাভ দিয়ে পনির ও ঘি ক্রয় করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন সফল ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীতে পরিণত হন। তাঁর ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা সম্পর্কে তিনি নিজেই বলতেন, আমি যদি মাটি থেকে একটি পাথরও উঠাই, আশা করি তার নিচে স্বর্ণ বা রূপা পাব।
যুদ্ধজীবন : মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে জুজায়মা গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য যে দল পাঠান, আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ছিলেন সেই দলের অন্যতম সদস্য। মক্কা বিজয় থেকে বিদায় হজ পর্যন্ত কাফিরদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সকল গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ও যুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
খিলাফতে আবু বকর : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকালে তিনি একজন বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আবু বকর (রা.) নিজের ইন্তিকালের পূর্বে পরবর্তী খলিফা নির্ধারণের বিষয়ে সর্বপ্রথম যাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করেন, তাঁদের মধ্যে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ছিলেন অগ্রগণ্য। পরবর্তী খলিফা হিসেবে হজরত উমর (রা.)-এর নাম প্রস্তাব করা হলে তিনি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন মত প্রকাশ করে বলেন, ‘তাঁর যোগ্যতা প্রশ্নাতীত, তবে স্বভাব কিছুটা কঠোর।’ উত্তরে আবু বকর (রা.) বলেছিলেন, ‘আমার নরম স্বভাবের কারণেই তিনি কঠোর ছিলেন, দায়িত্ব পেলে তিনি নিজেই সংযত হয়ে যাবেন।’
খিলাফতে উমর : হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) খলিফা হওয়ার পর পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য যে বিশেষ পরামর্শ পরিষদ গঠন করেন, আব্দুর রহমান ইবন আওফ (রা.) ছিলেন তার অন্যতম প্রধান সদস্য। বহু ক্ষেত্রে তাঁর মতামতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হতো। ইরাক অভিযানের সময় জনগণ চাইছিলেন খোদ আমিরুল মুমিনিন উমর (রা.) সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করুন। উমর (রা.)-ও এতে আগ্রহী ছিলেন। একমাত্র আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) এর বিরোধিতা করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘আল্লাহ না করুন যদি মুসলিম বাহিনী পরাজিত হয় এবং আমিরুল মুমিনিনের কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে ইসলামের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে।’ তাঁর এই দূরদর্শী বক্তব্যে অন্যান্য সাহাবিরাও একমত হন।
নবীজির সাহচর্যের বরকত : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দীর্ঘ সাহচর্যে থেকে হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) শরিয়তের গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। খোলাফায়ে রাশেদার যুগে সেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি বহু সংকটময় মুহূর্তে উম্মাহকে সঠিক পথের দিশা দেখিয়েছেন।
খিলাফতে উসমান ও ইন্তিকাল : হজরত উসমান (রা.)-এর খিলাফতকালে তিনি নীরব ও সংযত জীবনযাপন শুরু করেন। এই সময়েই ৩১ হিজরিতে তিনি ইন্তিকাল করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় পঁচাত্তর বছর। হজরত উসমান (রা.) নিজে তাঁর জানাজার ইমামতি করেন এবং জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করা হয়।
সাহাবিদের শোক : তাঁর ইন্তিকালে সাহাবায়ে কিরাম গভীরভাবে শোকাহত হন। হজরত আলি (রা.) তাঁর মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘হে ইবনে আওফ! তুমি দুনিয়ার স্বচ্ছ পানি পান করেছ এবং ঘোলা পানি পরিত্যাগ করেছ।’ হজরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিআল্লাহু আনহু জানাজা বহন করতে করতে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘ওয়াজাবালাহ! হায়, এক পাহাড়সম মানুষ আজ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল!’
নবীজির প্রতি মহব্বত : হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বর্ণনা করেন, আমরা কয়েকজন সাহাবি সচরাচর রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে আলাদা থাকতাম না। আমাদের ধারণা ছিল, যেকোনো সময় তাঁর কোনো প্রয়োজন দেখা দিতে পারে, তখন যেন আমরা নিকটেই থাকি এবং নবীজির প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসতে পারি।
একদিন আমি নবী কারিম (সা.)-এর খোঁজে তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম। তিনি তখন নিজের বাসস্থান থেকে বের হয়ে একটি বাগানের দিকে যাচ্ছিলেন। আমিও নীরবে তাঁর পেছনে পেছনে চলতে থাকলাম। বাগানে প্রবেশ করেই তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাজে তিনি এত দীর্ঘ সময় সেজদায় নিমগ্ন রইলেন যে আমার অন্তর অস্থির হয়ে উঠল। এমন বিলম্ব দেখে আমার চোখ দিয়ে অশ্রæ ঝরে পড়ল। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, আল্লাহ না করুন, হয়তো রাসুলুল্লাহ (সা.) দুনিয়ার সফর সমাপ্ত করেছেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি সেজদা থেকে মাথা উঠালেন। আমাকে অশ্রুসিক্ত অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কী হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সেজদা দেখে আমি আশঙ্কায় পড়ে গিয়েছিলাম।’ নবীজি বললেন, ‘আমি এতক্ষণ আমার রবের শোকর আদায় করছিলাম। কারণ আল্লাহ তাআলা আমাকে এই সুসংবাদ দিয়েছেন, ‘হে নবী! আপনার উম্মতের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি একবার আপনার ওপর দরুদ পাঠ করবে, আমি তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪০৮)
দুনিয়ার প্রাচুর্য দেখে কান্না : হজরত নাওফেল (রা.) বর্ণনা করেন, আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) আমাদের সঙ্গে নিয়মিত ওঠাবসা করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উত্তম স্বভাবের হৃদয়বান ও স্নেহশীল মানুষ। তাঁর সাহচর্য আমাদের জন্য ছিল প্রশান্তির।
একদিন তিনি আমাদের মজলিসে আগমন করলেন। সে সময় আমাদের সামনে একটি বড় পেয়ালা এনে রাখা হলো, যাতে ছিল রুটি ও গোশত। খাবার পরিবেশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর চোখ ভিজে উঠল। তিনি অশ্রæসিক্ত হয়ে পড়লেন।
কান্নার মাঝেই তিনি বললেন, ‘আমি কেন কাঁদব না? রাসুলুল্লাহ (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। অথচ তিনি এবং তাঁর পরিবার কখনো পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে যবের রুটিও খেতে পারেননি।’
এই কথা বলে তিনি আরও ভারাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। প্রাচুর্যের সামনে দাঁড়িয়েও তাঁর হৃদয় ফিরে গেল নবীজির সহজ-সাধনা, দারিদ্র্য ও ত্যাগে ভরা জীবনের দিকে। দুনিয়ার স্বাচ্ছন্দ্য তাঁর চোখে তখন ভারী হয়ে উঠল, আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুনিয়াবি সরঞ্জাম ত্যাগ ও কষ্টের স্মৃতি তাঁর অন্তরকে অশ্রুতে ভিজিয়ে দিল। (আল ইসাবাহ: ২/৪১৭)
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

