অহঙ্কারের কুফল ও অহঙ্কারীর ভয়াবহ পরিণতি
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০১
মানুষকে আল্লাহ তাআলা আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। জ্ঞান, বিবেক ও নৈতিকতার মাধ্যমে মানুষ অন্য সব সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব টিকে থাকে কেবল বিনয় ও নম্রতার মাধ্যমে। অহঙ্কার এমন এক মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি, যা মানুষের ইমান, চরিত্র ও মানবিকতাকে ধ্বংস করে দেয়। কোরআন ও হাদিসে অহঙ্কারকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে এবং এর পরিণতি সম্পর্কে বারবার সতর্ক করা হয়েছে।
অহঙ্কারের প্রকৃত অর্থ
ইসলামের দৃষ্টিতে অহঙ্কার শুধু নিজের বড়াই করা নয়; বরং সত্যকে জেনেও তা প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করাই হলো প্রকৃত অহঙ্কার। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন- অহঙ্কার হলো সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছ মনে করা।- (সহীহ মুসলিম: ৯১) এই হাদিসে অহঙ্কারের দুটি মূল বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে- সত্যবিমুখতা ও মানব অবমূল্যায়ন।
অহঙ্কারের প্রথম শিকার : ইবলিস
অহঙ্কারের ইতিহাস শুরু হয় ইবলিসের মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা যখন আদম (আ.)-কে সিজদা করার আদেশ দেন, তখন ইবলিস অহঙ্কারবশত তা অমান্য করে। সে নিজের সৃষ্টি উপাদানকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিল। আল্লাহ বলেন- সে বলল, আমি তার চেয়ে উত্তম; তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছ আর তাকে সৃষ্টি করেছ মাটি থেকে।- (সূরা আল-আরাফ: ১২) এই অহঙ্কারের কারণেই ইবলিস আল্লাহর রহমত থেকে চিরতরে বিতাড়িত হয়। এটি প্রমাণ করে- অহঙ্কার ইমান ধ্বংসের প্রথম ধাপ।
দুনিয়াতে অহঙ্কারের কুফল
অহঙ্কারী মানুষ সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য নষ্ট করে। অহঙ্কার মানুষের চরিত্রে এমন কিছু মারাত্মক প্রভাব ফেলে-
* উপদেশ গ্রহণের ক্ষমতা নষ্ট করে
* নিজের ভুল স্বীকারে বাধা দেয়
* মানুষে মানুষে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে
* ক্ষমতার অপব্যবহার ও জুলুমকে উৎসাহিত করে।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ অহঙ্কারী ও আত্মম্ভরী ব্যক্তিকে ভালোবাসেন না।”- (সূরা আন-নিসা : ৩৬) আল্লাহর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়া মানেই দুনিয়া ও আখিরাতে ব্যর্থতা।
অহঙ্কার ও সত্য প্রত্যাখ্যান : ফেরাউনের পরিণতি
ইতিহাসে অহঙ্কারের সবচেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হলো ফেরাউন। ক্ষমতা ও রাজত্বের অহঙ্কারে সে নিজেকে উপাস্য দাবি করেছিল এবং আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার করেছিল। আল্লাহ বলেন- ফেরাউন ও তার সম্প্রদায় অহঙ্কার করেছিল এবং তারা ছিল সীমালঙ্ঘনকারী।” - (সূরা ইউনুস : ৭৫) ফলস্বরূপ, দুনিয়াতেই ফেরাউন ধ্বংস হয় এবং আখিরাতে তার জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।
অহঙ্কারীর আখিরাতের ভয়াবহ পরিণতি
আখিরাতে অহঙ্কারীদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা ও শাস্তি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।- (সহিহ মুসলিম:৯১) আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) অহঙ্কারীদের অবস্থা সম্পর্কে বলেন- কিয়ামতের দিন অহঙ্কারীদের মানুষরূপে উঠানো হবে, কিন্ত‘ তারা হবে পিঁপড়ার মতো ক্ষুদ্র; অপমান সবদিক থেকে তাদের ঘিরে ধরবে।” - (সুনানে তিরমিজি: ২৪৯২) এই হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়-অহঙ্কার জান্নাতের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
অহঙ্কারের মূল কারণসমূহ
মানুষ সাধারণত যেসব কারণে অহঙ্কারী হয়ে ওঠে-
* সম্পদ ও বিত্তের অহঙ্কার
* ক্ষমতা ও পদমর্যাদার মোহ
* জ্ঞান ও বংশগত মর্যাদার গর্ব
* আত্মসমালোচনার অভাব।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন- নিশ্চয়ই মানুষ সীমালঙ্ঘন করে, কারণ সে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে।- (সূরা আল-আলাক : ৬–৭)
বিনয় : অহঙ্কারের প্রকৃত প্রতিষেধক
ইসলাম অহঙ্কারের বিপরীতে বিনয়কে সর্বোচ্চ মানবিক গুণ হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন বিনয়ের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদায় উন্নীত করেন।— (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮) বিনয় মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে এবং সমাজে সম্মানিত করে।
পরিশেষে বলতে চাই, অহঙ্কার মানুষকে বাহ্যিকভাবে বড় মনে করালেও প্রকৃতপক্ষে তাকে আত্মিকভাবে ধ্বংস করে দেয়। ইবলিস ও ফেরাউনের পরিণতি আমাদের জন্য স্পষ্ট শিক্ষা। পক্ষান্তরে বিনয়, নম্রতা ও সত্য গ্রহণই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। অতএব, আমাদের উচিত নিজেদের সব অর্জনকে আল্লাহর দান হিসেবে মেনে নেওয়া, মানুষকে সম্মান করা এবং অহঙ্কার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। কারণ অহঙ্কারের পথ ধ্বংসের, আর বিনয়ের পথই মুক্তির।
লেখক : ধর্মবিষয়ক প্রবন্ধকার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

