Logo

আইন ও বিচার

কাটছে না দুর্নীতির কালো ছায়া : আদালতের ভেতরে ঘুষ

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:২৬

কাটছে না দুর্নীতির কালো ছায়া : আদালতের ভেতরে ঘুষ

আদালত ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত আশ্রয়স্থল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিচারালয়ের ভেতর থেকেই ঘুষ, অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। বিচার বিভাগের কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি ঘুষ গ্রহণ করেন বা সুবিধা গ্রহণে জড়িত হন, সেটি শুধু দুর্নীতি দমন কমিশন আইনেই নয়, বরং দণ্ডবিধি ও সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি অনুসারে গুরুতর ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। আইনের চোখে এ অপরাধের শাস্তি কঠোর এমনকি আজীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

আদালতের কর্মচারীরা প্রকাশ্য ঘুষ চান, এমন তথ্য এসেছিল বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে। খোদ বিচারকরাও মনে করেন সাপোর্ট স্টাফরা ঘুষ চান। চলতি বছরে সংস্কার কমিশন পরিচালিত অনলাইন জরিপে ৬৬ শতাংশ বিচারক এমন মত দিয়েছেন। 

জরিপের অংশ নিয়ে আদালতের কর্মীদের ঘুষ নেয়ার বিষয়ে মত দিয়েছেন সাধারণ নাগরিক ও আইনজীবীরাও। কমিশনের প্রতিবেদনে বিচারাঙ্গনের দুর্নীতি-অনিয়মের সম্ভাব্য ৮টি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধে করণীয় উল্লেখ করে কিছু সুপারিশও করেছে কমিশন।

প্রতিবেদনে নাগরিক, বিচারক ও আইনজীবীদের ওপর অনলাইনে পরিচালিত জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে। জরিপে প্রশ্ন ছিল, ‘আদালতের কর্মচারী সম্পর্কে আপনার ধারণা কেমন?’। এতে অংশ নেন ১১ হাজার ২২৫ জন নাগরিক। ৯ হাজার ৫৩০ জন মনে করেন, আদালতের কর্মচারীরা ঘুষ চান। যা মোট অংশগ্রহণকারীর ৮৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। একই প্রশ্নে আইনজীবীদের জরিপে, ৯১ দশমিক ৭০ শতাংশ আইনজীবী মনে করেন আদালতের কর্মচারীরা ঘুষ চান। এখানে মোট ২২৮ জন আইনজীবী অংশ নেন। জরিপে বিচারকদের কাছে প্রশ্ন ছিল ‘কোর্ট সাপোর্ট স্টাফদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কেমন?’ অংশ নেয়া ১৮৮ জন বিচারকের মধ্যে ১২৪ জনই বলেন, সাপোর্ট স্টাফরা ঘুষ চান। যা অংশগ্রহণকারী বিচারকদের ৬৬ শতাংশ।

বিচারাঙ্গনে দুর্নীতি-অনিয়মের সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে মোট বিচারকের সংখ্যা ২ হাজার ৩০০ জনের কিছু বেশি। এই স্বল্পসংখ্যক বিচারকের মাধ্যমে ৪৩ লাখ মামলা নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হচ্ছে।

আবার বিচার প্রক্রিয়ায় বিচারক ছাড়াও অপরিহার্য অংশীজন হচ্ছেন আইনজীবী, পুলিশ, আইনজীবী সহকারী, আদালতের সহায়ক জনবল। একজন বিচারপ্রার্থীকে এসব ব্যক্তিদের সঙ্গে মামলার বিভিন্ন প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে হয়। তাদের কারও কারও দ্বারা বিচারপ্রার্থীরা হয়রানির শিকার হন। আর এই হয়রানি এড়াতে অনেকে বাধ্য হন ঘুষ বা বিভিন্নভাবে অর্থ প্রদান করতে। আবার কেউ অবৈধ সুবিধা পেতেও ঘুষ দেন।

চলতি বছরে বিচারাঙ্গনে দুর্নীতি-অনিয়মের ৮টি উল্লেখযোগ্য কারণ তুলে ধরা হয়েছিল সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে। বিচারক ও বিচার সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী বিচারক, আইনজীবী, আদালতের কর্মচারী, আইনজীবী সহকারী, পুলিশ বা তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতার ঘাটতি। মামলার কার্যতালিকা আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা। আদালত প্রাঙ্গণে তথ্য সেবা প্রদানের জন্য তথ্য কেন্দ্র না থাকা। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নৈতিক কর্মঘণ্টার সর্বোচ্চ ব্যবহার না করা। আদালতের আওতাধীন বিভিন্ন দফতরের সিটিজেন চার্টার প্রদর্শন না করা। আইনজীবীদের মধ্যে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের উদ্যোগহীনতা। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের তদারকি ব্যবস্থায় ঘাটতি। বিচারক বা অফিস প্রধানদের অধীন কর্মচারীদের তদারকি ব্যবস্থায় ঘাটতি। অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা বা অভিযোগ বক্সের অনুপস্থিতি।

এদিকে গত মার্চে শরীয়তপুর জেলা আদালতে কর্মচারীদের ঘুষ ও ফি নির্ধারণ নিয়ে চলমান বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে অভিযোগ বাক্স স্থাপন করার আদেশ দিয়েছেন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

আদালতের বিভিন্ন শাখায় ঘুষ নেয়া ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আজ সোমবার এই সিদ্ধান্ত আসে। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাসের সামনে এই অভিযোগ বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ইমেইলে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।

সম্প্রতি শরীয়তপুর আইনজীবী সমিতির এক সভায় আদালতের পেশকার, পিয়ন ও কোর্ট পুলিশের জন্য ঘুষের নির্ধারিত হার ঠিক করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কে সৃষ্টি হয়। পরে আদালত ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। 

 বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ধারা ১৬১- ঘুষ গ্রহণের অপরাধ: 

কোনো সরকারি কর্মচারী যদি নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার করে, কারও কাছ থেকে অর্থ বা সুবিধা গ্রহণ করে, সেটি ঘুষ হিসেবে গণ্য হবে। শাস্তি- সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা, এবং পদচ্যুতি বা চাকরিচ্যুতি।

 ধারা ১৬২- ঘুষ প্রদানকারীর অপরাধ: 

যে ব্যক্তি ঘুষ দেয় বা দিতে প্রস্তাব করে, তাকেও একইভাবে অপরাধী ধরা হয়। শাস্তি ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।

ধারা ১৬৩-১৬৫ :

প্রভাব খাটানো ও অসাধু ব্যবহার- কোনো সরকারি কর্মচারী “উপহার, প্রতিশ্রুতি বা পুরস্কার” গ্রহণ করলে সেটিও ঘুষ হিসেবে গণ্য হয়। উল্লেখ্য, বিচারকও Public Servant হিসাবে এই আইনের আওতায় পড়েন।

 দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ :

ধারা ২(খ) ও ১৯ অনুযায়ী, দুর্নীতি বা ঘুষের অভিযোগে কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত ও মামলা করার ক্ষমতা শুধুমাত্র দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। গুরুত্বপূর্ণ ধারা- ধারা ২৬ থেকে ২৮ : যদি কেউ অবৈধ সম্পদ অর্জন করে বা বৈধ উৎস ব্যাখ্যা দিতে না পারে, সেটি দুর্নীতি বলে গণ্য। শাস্তি ৩ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত। দুর্নীতি দমন আইন, ১৯৪৭ (সংশোধিত ১৯৯২) অনুযায়ী সরকারি কর্মচারী বা বিচারক ঘুষ নিলে বা সুবিধা আদান-প্রদান করলে ঈৎরসরহধষ গরংপড়হফঁপঃ ধরা হয়। শাস্তি ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।

 সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯: 

ধারা ৩(২) : কোনো সরকারি কর্মচারী উপহার, ঘুষ, কমিশন বা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না। শাস্তি প্রশাসনিকভাবে বরখাস্ত, পদাবনতি বা বাধ্যতামূলক অবসর।

 বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিশেষ পদ্ধতি:

বিচারকরা সংবিধান অনুসারে বিচার বিভাগীয় সুরক্ষা পান, তাই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন। 

 বাংলাদেশ সংবিধান ধারা ৯৬: 

বিচারক অপসারণ বা শাস্তির জন্য “সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল” গঠন করা হয়। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, প্রেসিডেন্ট বিচারককে অপসারণ করতে পারেন। দুদক তদন্ত শুরু করতে পারে, তবে অনুমতি লাগে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নিকট থেকে। বিচারকের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা নয়, বরং তদন্ত, এরপর অনুমোদন, বিচারিক প্রক্রিয়া- এই তিন ধাপ পেরিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

 ঘুষের অপরাধ প্রমাণে করণীয় ধাপ : 

অভিযোগ দাখিল করা হয় দুদক বা সংশ্লিষ্ট থানায়। ট্র্যাপ অপারেশন” বা বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয় (ঘুষ নেয়ার সময় হাতেনাতে ধরার ব্যবস্থা)। প্রমাণ (টাকা, ভিডিও, সাক্ষ্য) সংগ্রহ করে আদালতে মামলা দায়ের। দোষী সাব্যস্ত হলে ফৌজদারী আদালতে সাজা, পাশাপাশি চাকরি থেকে অপসারণ।

২০২৩ সালে কুমিল্লা জেলা জজ কোর্টের পিয়ন মো. আমিনুল ইসলাম ঘুষের টাকা নিতে গিয়ে দুদকের হাতে হাতেনাতে গ্রেফতার। এর আগে ২০২২ সালে বরিশালে মেট্রোপলিটন কোর্টের নাজির রফিকুল ইসলাম ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নেয়ায় ৫ বছরের কারাদণ্ড। ২০২১ সালে  ঢাকার এক ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টের স্টাফের বিরুদ্ধে মামলার নথি পরিবর্তনের বিনিময়ে অর্থ নেয়ার অভিযোগে তদন্ত চলছে।

 ঘুষের অপরাধে অভিযুক্ত হলে সম্ভাব্য শাস্তি:

অপরাধ প্রযোজ্য আইন সর্বোচ্চ শাস্তি, ঘুষ গ্রহণ দণ্ডবিধি ১৬১ ধারা মোতাবেক ৭ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা ঘুষ প্রদান দণ্ডবিধি ১৬২ : ৭ বছর কারাদণ্ড, দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জন দুদক আইন ২০০৪, ধারা ২৬ : ১০ বছর কারাদণ্ড, সরকারি কর্মচারী আচরণ লঙ্ঘন ১৯৭৯ বিধিমালা চাকরি হারানো বা বরখাস্ত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র আইনজীবী একেএম শাহিনুল ইসলাম বলেন, আদালত প্রশাসনেই যখন দুর্নীতি ঢুকে যায়, তখন বিচারপ্রার্থীদের আস্থা নষ্ট হয়। বিচার বিভাগের অভ্যন্তরে ঘুষের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ করা জরুরি।

নরসিংদী জেলা  জজ কোর্টের আইনজীবী শরিফুল ইসলাম চৌধুরী দর্পন বলেন, দুদকের ক্ষমতা বাড়ানো ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সম্পদের বার্ষিক হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত। আদালত হচ্ছে ন্যায়বিচারের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। সেখানকার কর্মকর্তা বা বিচারক ঘুষ গ্রহণ করলে তা শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয় বরং গোটা বিচারব্যবস্থার প্রতি আঘাত। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন ও সংবিধান অনুযায়ী ঘুষের অপরাধ কঠোর শাস্তিযোগ্য, কিন্তু এর বাস্তব প্রয়োগ ও দ্রুত বিচারই জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।

যতক্ষণ পর্যন্ত “ঘুষহীন বিচারব্যবস্থা” প্রতিষ্ঠিত না হয়, ততক্ষণ ন্যায়বিচারের মন্দির অপবিত্র থেকে যাবে। 

বিকেপি/এনএ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন