শামুকের অবৈধ বাণিজ্য
আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৩৭
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের জলাশয়, খালবিল ও নদী-নালা জুড়ে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির শামুক কয়েক দশক ধরে কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু স¤প্রতি দেশজ শামুকের প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারের আগ্রহ বৃদ্ধির ফলে অবৈধভাবে সংগ্রহ, পরিবহন, পাইকারি বেচাবিক্রি ও রপ্তানির প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। এই বাণিজ্যের পেছনে সক্রিয় রয়েছে একাধিক চক্র, যারা বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে প্রতিনিয়ত দেশের জীববৈচিত্র্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী শামুকসহ যে কোনো বন্যপ্রাণী পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় বা রপ্তানি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
শাস্তি:
সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড। সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডই প্রযোজ্য।
এই আইনের লক্ষ্য ঘরোয়া ও বন্যজ পরিবেশে থাকা শামুক ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর টিকে থাকা ও বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষা করা।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আইনটি কার্যকর হলেও এর প্রয়োগে এখনও নানা দুর্বলতা রয়ে গেছে।
নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ফরিদপুর, বরিশাল, রাজশাহী, গাইবান্ধা, খাগড়াছড়ি, পটুয়াখালী এবং সিলেট অঞ্চলে অনুসন্ধানে দেখা যায়- বর্ষা মৌসুম শুরু হলে বিভিন্ন স্থানীয় দালালেরা গ্রামের দরিদ্র মানুষদের দিয়ে বিপুল পরিমাণে শামুক সংগ্রহ করায়। ১০-১৫ টাকা কেজিতে সংগ্রহ করা এই শামুক পরে ট্রাকে করে রাজধানীসহ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পাঠানো হয়। নির্দিষ্ট চক্রগুলো এরপর সেগুলো ভারতে পাচার করে বা রপ্তানির ‘আধা-বৈধ’ কাগজপত্র তৈরি করে বিদেশ পাঠানোর চেষ্টা করে থাকে। নরসিংদী শিবপুরের স্থানীয় কৃষক আবদার আলী মিয়া বাংলাদেশের খবরকে জানান, “ধানের জমিতে শামুক দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাচ্ছে। আগে জমি নরম রাখতে ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে শামুকের ভূমিকা ছিল, এখন এগুলো প্রায় দেখা যায় না।”
এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনেও। কারণ শামুক জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের খবরের অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটি সাধারণত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত- স্থানীয় সংগ্রাহক: দরিদ্র শ্রমিকরা যারা প্রতিদিন জলাশয় থেকে শামুক তুলে আনে।
মাঝারি দালাল :
যারা গ্রাম থেকে ২০০-৩০০ কেজি করে শামুক সংগ্রহ করে ট্রাকযোগে বড় পাইকারদের কাছে পাঠায়।
পাইকার ও রপ্তানিকারক চক্র :
বন্দর ও সীমান্তে এদের সক্রিয়তা বেশি। অনেকেই খাদ্য ও পশুখাদ্য রপ্তানির নামে শামুক পাচার করে থাকে।জানতে চাইলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সদস্য বাংলাদেশের খবরকে জানান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চক্রগুলো গোপন ভান্ডার ব্যবহার করে যেখানে একসাথে টনকে টন শামুক মজুত থাকে। এদিকে বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন যে, শামুক কমে গেলে নদী ও বিলের জল পরিশোধন প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছের খাদ্য শৃঙ্খলে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। ধানের জমিতে জৈব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। পানি দূষণের হার দ্রুত বৃদ্ধি পায়।একজন পরিবেশবিদ মন্তব্য করেন, “উৎপাদনশীল জলজ বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে শামুক অপরিহার্য। এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে মাছ চাষ ও কৃষি দুটোই ক্ষতির মুখে পড়বে।”
আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা :
বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের এক কর্মকর্তারা জানান, জনবল ও বাজেট সীমিত, দূরবর্তী এলাকায় নজরদারি কম, স্থানীয় পর্যায়ে আইনের গুরুত্ব সম্পর্কে কম সচেতনতা- এসবের কারণে শামুক পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। অতিরিক্ত হিসেবে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির জড়িত থাকার কারণে অনেক সময় অভিযান বাধাগ্রস্ত হয় বলে অভিযোগও আছে। বিশেষজ্ঞ, পরিবেশকর্মী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পরামর্শ দেন স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, গ্রামাঞ্চলে পোস্টার, লিফলেট ও স্কুল পর্যায়ে ক্যাম্পেইন চালানো। কঠোর নজরদারি— নদী, খাল-বিল, সড়ক ও সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত অভিযান। বিকল্প জীবিকা— শামুক সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত দরিদ্র মানুষদের জন্য সরকারি পুনর্বাসন কার্যক্রম। আইনের কঠোর প্রয়োগ— রপ্তানিকারক চক্র ও দালালদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও শাস্তি নিশ্চিত করা। গবেষণা ও তথ্যভান্ডার তৈরিতে বিনিয়োগ- কত শামুক দেশে আছে, কতটা সংগ্রহ হয়- এসব তথ্য বর্তমানে স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশের জলজ পরিবেশকে সুস্থ ও টেকসই রাখতে হলে অবৈধ শামুক বাণিজ্য এখনই বন্ধ করা জরুরি। আইন স্পষ্ট- শামুক পরিবহন, ক্রয়, বিক্রয় ও রপ্তানি অপরাধ। কিন্তু শুধুমাত্র আইন থাকলেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ, সচেতনতা ও পরিবেশ সংরক্ষণে সকলের সমন্বিত উদ্যোগ।
বিকেপি/এমবি

