সুগন্ধি সিগারেটে ধুঁকছে তরুণরা
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অকার্যকর
আইন ও আদালত ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৫৭
রাজধানী ঢাকায় গত কয়েক বছরে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ফ্লেভারযুক্ত বা সুগন্ধি সিগারেটের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। মেন্ট হল, স্ট্রবেরি, চকলেট, আঙুর, ভ্যানিলা, ব্লু আইস- এমন নানা ফ্লেভারের সিগারেট এখন তরুণদের কাছে আকর্ষণীয়, আধুনিক ও তুলনামূলক ‘নরম’ একটি ধূমপানের বিকল্প হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরা পর্যন্ত ক্যাফে, রুফটপ রেস্টুরেন্ট, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং শপিং সেন্টারে এগুলো ব্যবহার করছে। অথচ বাস্তবে, এই সুগন্ধি সিগারেটগুলো সাধারণ সিগারেটের চেয়ে কোনো অংশে কম ক্ষতিকর নয়, বরং ফ্লেভার যুক্ত করার জন্য অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
এদিকে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন থাকা সত্ত্বেও তার কার্যকারিতা নগণ্য হওয়ায় এসব পণ্য বাজারে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এটি নতুন এক উদ্বেগ তৈরি করেছে। সমাজবিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, সুগন্ধি সিগারেট তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে- সুগন্ধের কারণে ধোঁয়া কম বিরক্তিকর, মেন্ট হল বা স্ট্রবেরি ফ্লেভারের ধোঁয়া, তুলনামূলকভাবে মিষ্টি হওয়ায় নতুন ব্যবহারকারীরা সহজে আসক্ত হয়ে পড়ছে। ধোঁয়ায় সাধারণ সিগারেটের মতো তীব্র গন্ধ না থাকায় অনেকেই মনে করছেন এটি ক্ষতিকর নয়। বিশেষ করে ক্যাফে ও সামাজিক মেলামেশার পরিবেশে সুগন্ধি সিগারেট তরুণদের কাছে ফ্যাশন ও স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইনস্টাগ্রামে স্মোকিং পোস্ট, টিকটকে ‘ফ্লেভার চ্যালেঞ্জ’- এসবও তরুণদের প্রভাবিত করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর প্রায় সব দোকানেই এগুলো খোলা অবস্থায় বিক্রি হচ্ছে। দাম কম হওয়ায় স্কুল-কলেজপড়ুয়াদের কাছেও সহজে পৌঁছে যাচ্ছে। যদিও তামাক বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, তবুও ‘ফ্লেভার পারফিউম’, ‘মেন্থল কুলিং’ কিংবা ‘ফ্রেশ আইস’-এমন শব্দে প্রচ্ছন্ন বিজ্ঞাপন চলছে। রঙিন প্যাকেটগুলো তরুণদের আকৃষ্ট করছে।
বাংলাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ ও সংশোধনী ২০১৩ অনুযায়ী- ১৮ বছরের নিচে কাউকে সিগারেট বিক্রি নিষিদ্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে তামাক বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, খোলা সিগারেট বিক্রি আইনত অপরাধ, প্যাকেটে স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে আইনগুলো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
রাজধানীর শনিরআখড়া, ফার্মগেট, নীলক্ষেত, বেইলি রোড, ধানমন্ডি, উত্তরার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের সামনে প্রকাশ্যে ফ্লেভারযুক্ত সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। দোকানদারদের প্রশ্ন করলে তারা বাংলাদেশের খবরকে বলেন, “আইন কেউ মানে না। পুলিশ চাইলে একদিন ধরবে; পরদিন আবার আগের মতো বিক্রি।”
এদিকে তামাকবিরোধী সংস্থাগুলোর দাবি আইন বাস্তবায়নে নিয়মিত মনিটরিং নেই। দোকান উচ্ছেদ কার্যক্রম ধারাবাহিক নয়। ফ্লেভারযুক্ত তামাক পণ্যের বিরুদ্ধে বিশেষ কোনো অভিযান হয় না। বড় কোম্পানিগুলোর প্রভাব থাকায় বাজারে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফ্লেভার সিগারেটে স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্বিগুণ : চিকিৎসকদের মতে, সুগন্ধি সিগারেটকে ‘হালকা’ বা ‘কম ক্ষতিকর’ মনে করা সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। দুই কারণে এটি বেশি ক্ষতিকর। নিকোটিনের মাত্রা দ্রুত গ্রহণ করতে সহায়তা করে। মিষ্টি ধোঁয়া গলায় কম জ্বালা সৃষ্টি করে, ফলে ব্যবহারকারী অতিরিক্ত ড্র হওয়া ধোঁয়া সহজেই গ্রহণ করে। এভাবে নিকোটিন শরীরে দ্রুত পৌঁছে যায় এবং আসক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফ্লেভার যোগ করতে ব্যবহৃত রাসায়নিক আরও বিপজ্জনক। ডাইএথিলিন গ্লাইকোল, বেনজয়েট, এসিটালডিহাইড- এমন বহু রাসায়নিক ব্যবহার হয়, যেগুলো শ্বাসযন্ত্র ও ফুসফুসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে হাঁপানি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট হৃদরোগ, দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস ক্যানসারের সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসক মুঠোফোনে জানান, তরুণদের মধ্যে এখন আগের তুলনায় আগেভাগেই শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা দেখা দিচ্ছে- যার পেছনে সুগন্ধি সিগারেট বড় ভূমিকা রাখছে। এদিকে নারী ধূমপানে উদ্বেগ বাড়ছে। পূর্বে ধূমপানকে মূলত পুরুষদের অভ্যাস হিসেবে দেখা হলেও বর্তমান প্রজন্মের তরুণীরা ফ্লেভারযুক্ত সিগারেটের প্রধান ব্যবহারকারী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ক্যাফে ও আড্ডাকেন্দ্রিক পরিবেশে মেয়েদের প্রকাশ্যে ধূমপান এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এর ফলে নারী স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে, বিশেষত- হরমোনাল সমস্যা, গর্ভধারণের সক্ষমতায় প্রভাব, ত্বকের সময়ের আগেই ক্ষতি, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা ইত্যাদি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্লেভারযুক্ত সিগারেট নিয়ন্ত্রণে তিনটি দিক সবচেয়ে জরুরি- বাজারে ফ্লেভারযুক্ত তামাক নিষিদ্ধ করা। বেশ কয়েকটি দেশে ফ্লেভার সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশেও এ উদ্যোগ নিতে হবে।
এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে কঠোর তদারকি চালাতে হবে। ১০০ গজ এলাকার নিয়ম সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নিয়মিত অভিযানে খোলা সিগারেট বিক্রি বন্ধ। খোলা সিগারেটই তরুণদের ধূমপানে সহজ প্রবেশদ্বার। এটি বন্ধ করলে সিগারেটের ব্যবহার কমবে।
পরিবার, শিক্ষক, মিডিয়া-সবার প্রচেষ্টা দরকার। ভুল ধারণা ভেঙে বলতে হবে- সুগন্ধি সিগারেটও প্রাণঘাতী।
রাজধানীর তরুণ প্রজন্ম যে হারে সুগন্ধি সিগারেটে ঝুঁকছে, তা ভবিষ্যতের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। সফট স্মোক, স্মার্ট স্মোক, ফ্লেভার ফান- এসব নাম তরুণদের ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হলে সামনে বড় স্বাস্থ্য বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্র- তিন পক্ষের সমন্বিত ব্যবস্থা ছাড়া তরুণদের এই ‘মিষ্টি বিষ’ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
বিকেপি/এমবি

