Logo

আইন ও বিচার

মানুষের তৈরি আইনে প্রথম মৃত্যুদণ্ড

ইতিহাস, বিতর্ক ও সভ্যতার শিক্ষা

Icon

আইন ও আদালত ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:২১

মানুষের তৈরি আইনে প্রথম মৃত্যুদণ্ড

মানুষ যখন সংঘবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করে, তখন থেকেই নিয়ম, শাসন ও শাস্তির ধারণার জন্ম। সমাজ টিকিয়ে রাখতে মানুষ নিজেই আইন তৈরি করেছে- আর সেই আইনের সর্বোচ্চ ও কঠোর শাস্তি হিসেবে এসেছে মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসি। প্রশ্ন ওঠে, মানুষের তৈরি আইনে পৃথিবীতে প্রথম কাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, কারণ প্রাচীন ইতিহাসে বহু ঘটনার লিখিত ও নির্ভরযোগ্য দলিল অনুপস্থিত। তবে ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন ও সুস্পষ্টভাবে নথিভুক্ত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস (Socrates)।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ সালে এথেন্স নগররাষ্ট্রের আইনে সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এটি কোনো যুদ্ধবন্দি হত্যা বা রাজকীয় আদেশে নির্বিচার হত্যা ছিল না; বরং এটি ছিল নাগরিকদের নিয়ে গঠিত আদালতে বিচার, অভিযোগ, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং রায় ঘোষণার মাধ্যমে সম্পন্ন একটি শাস্তি। এই কারণেই অনেক ইতিহাসবিদ সক্রেটিসকে মানুষের তৈরি আইনের আওতায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম সুপরিচিত ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল- তিনি যুবসমাজকে বিপথগামী করছেন এবং নগররাষ্ট্রের দেবতাদের বাবা তাদের অস্বীকার করছেন। আজকের দৃষ্টিতে এসব অভিযোগ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত মনে হলেও, তৎকালীন এথেন্সে এগুলো ছিল গুরুতর অপরাধ। আদালতের রায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাকে হেমলক (এক ধরনের বিষ) পান করিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ।

এর আগেও অবশ্য মানুষের তৈরি আইন ছিল। ইতিহাসে সর্বপ্রাচীন লিখিত আইনসংকলন হিসেবে পরিচিত ব্যাবিলনের হাম্মুরাবির বিধিসংহিতা (খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৭৫০)- তে মৃত্যুদণ্ডের বহু বিধান ছিল । চুরি, মিথ্যা

সাক্ষ্য, ব্যভিচারসহ নানা অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের কথা সেখানে উল্লেখ আছে। কিন্তু সমস্যা হলো এই আইনে প্রথম কাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তার কোনো নির্দিষ্ট নাম বা নির্ভরযোগ্য দলিল পাওয়া যায় না। ফলে ব্যক্তির পরিচয়সহ নিশ্চিত তথ্যের অভাবে ইতিহাস সেখানে নীরব ।

এই কারণেই সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এটি শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি আইনের ক্ষমতা, রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘাতের এক ঐতিহাসিক উদাহরণ । সক্রেটিস চাইলে দেশত্যাগ করে প্রাণ বাঁচাতে পারতেন, কিন্তু তিনি আইনের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে শাস্তি মেনে নেন । তার এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী যুগে আইন, নৈতিকতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়।

এই ঘটনাটি আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়, আইন সব সময় ন্যায়ের সমার্থক নয়। আইন মানুষের তৈরি, আর মানুষ ভুল করতে পারে। সক্রেটিসের বিচার আজকের মানদণ্ডে অন্যায় বলে বিবেচিত হয়। অথচ সে সময় সেটিই ছিল বৈধ আইন। এখানেই মানুষের তৈরি আইনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বর্তমান বিশ্বেও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিতর্ক চলমান। কেউ মনে করেন এটি চূড়ান্ত ন্যায়বিচার, আবার কেউ মনে করেন এটি মানবাধিকারের পরিপন্থী। ইতিহাস আমাদের কোলকাতা, আইন পরিবর্তনশীল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে

সমাজের মূল্যবোধ বদলালে আইনও বদলায়। একসময় যা বৈধ ছিল, তা আজ অগ্রহণযোগ্য হতে পারে। সবশেষে বলা যায়, মানুষের তৈরি আইনে প্রথম সুস্পষ্টভাবে নথিভুক্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে সক্রেটিসের নাম ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতা একটি বড় শিক্ষা পেয়েছে- আইন শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু সেই আইন যেন মানবতা, ন্যায় ও বিবেকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সে বিষয়ে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে । কারণ আইনের চূড়ান্ত লক্ষ্য শাস্তি নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা।

বিকেপি/এনএ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইনি প্রশ্ন ও উত্তর আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর