Logo

আইন ও বিচার

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচারের নামে অবিচারের গল্প

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪০

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচারের নামে অবিচারের গল্প

বেগম খালেদা জিয়া আর নেই; এই খবর শুনেই আজ বাংলাদেশের রাজনীতির ভূমণ্ডলে নীরবতা বিরাজ করছে। আমাদের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, শক্তিশালী বিরোধী নেতা ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির অদম্য নায়ক হিসেবে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি আমাদের প্রজন্মের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। তাঁর নেতৃত্ব, সংগ্রাম ও আত্ম-ত্যাগের গল্প অগণিত মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত; কিন্তু শেষ দিনের বড় অংশটাই কেটেছে আইনি দফতর, মামলা ও বিচারব্যবস্থার জটিলতার সঙ্গে লড়াই করে। তাঁর মৃত্যুতে আমরা শুধু একজন রাজনীতিবিদের নয়, এক অভিভাবককে হারালাম।

খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে নির্ভীক ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান পরবর্তী ও সামরিক শাসিত সময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিরোধী দলের নেত্রীর বিরুদ্ধে মামলা ও আইনি দেদার পূর্বাচল তাঁর ক্যারিয়ারকে প্রায়চ্ছন্ন করেছিল।

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে এক বিশেষ প্রতীক। তিনি ১৯৯১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণ থেকে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু জীবনভর তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, বরং বিরোধী দলের নেত্রীত্ব ও সমগ্র রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর এক অভিভাবক হিসেবেও বিবেচিত হন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার পরিমণ্ডল ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: 

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সময়কালে যেসব মামলার অভিযোগ ছিল, তা শুধু একটি সাধারণ অপরাধমূলক অভিযোগের ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সেগুলো ছিল রাজনৈতিক প্রণোদিত, বিতর্কিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিচ্ছবি বলেই দাবি করা হয়েছে। বিশেষত ২০০৭-২০০৮ সালের caretaker সরকারের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভরষবফ মামলা-সমূহ ছিল দেশের রাজনৈতিক চরিত্রকেই ব্যাপকভাবে উঠে আসার মতো।

১৯৯০-২০০৬: রাজনৈতিক বিরোধ ও মামলা-ঝঞ্ঝাট

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মামলার সংখ্যা ছিল শতাধিক। ২০০৭ সালে যে ঘরশড় এৎধভঃ ঈধংব দায়ের করা হয়, সেটি ছিল একটি অর্থনৈতিক দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলা। ২০০৮ সালের এই মামলায় খালেদা জিয়া ও অন্যান্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে তারা ঘরশড় ঊহবৎমু ঈড়সঢ়ধহু-র সঙ্গে চুক্তি করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে বিশাল আর্থিক ক্ষতি করেছে। অবশ্য ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই মামলায় ঢাকার স্পেশাল জজ আদালত খালেদা জিয়া এবং ছয় জনকে অব্যাহতি দেয় এবং মামলাটি রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে উল্লেখ করে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি এবং মামলাটি মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছে।”

এই ধরনের মামলা-সমূহের মধ্যে ছিল Zia Charitable Trust ও Zia Orphanage Trust নামক দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলা, যা ২০১৮ সালে তাঁকে সাত বছরের সাজা দেয়। তবে এই সাজা পরে হাই কোর্ট এবং সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত উদ্ধৃত করে খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণভাবে অব্যাহতি দেয়া হয়। 

এছাড়াও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ডিফেমেশন বা মানহানির কয়েকটি মামলা ছিল, যেগুলিতে আদালত পরে তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে রায় দেন। 

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৩৭টি মামলা দায়ের হয়েছিল, যার মধ্যে বেশিরভাগ মামলায় তিনি জামিনে ছিলেন এবং বেশ কয়েকটিতেই আদালতের পর্যবেক্ষণে রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে উল্লেখ ছিল।

বিচারের নামে কি ছিল অবিচার?

খালেদা জিয়ার মামলাসমূহের প্রেক্ষাপট দেখলে বোঝা যায়, একমাত্র আইনগত মূল্যায়ন নয়- রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকেও এগুলো বিতর্কিত। বাংলাদেশে রাজনীতির তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে, তা খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার দিক থেকে যুগল নাটকের মতো পরিণত হয়েছে। এই রাজনৈতিক দ্ব›েদ্বর মাঝেই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারিক ব্যবস্থার চলাচল রাজনৈতিক চাপের প্রতিফলনও বহুগুণে দেখা গেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে এসব মামলার উদ্দেশ্য ছিল বিরোধী দলীয় নেতৃত্বকে ‘ভূঁই’য়ে নামিয়ে আনা, যেটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবেশকে বিষাক্ত করেছে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো Niko Graft Case-এ আদালতের পর্যবেক্ষণ, যেখানে বিচারক নিজেই মন্তব্য করেছেন যে মামলাটি রাজনৈতিকভাবে খালেদা জিয়াকে হয়রানি করতেই দায়ের করা হয়েছে। ​এ ধরনের মন্তব্য আদালতের রায়ে উঠে আসা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়-এটি ছিল একটি স্পষ্ট অভিঘাত রাজনৈতিক মামলা ও বিচার ব্যবস্থার সম্পর্কের ওপর।

পাশাপাশি, Zia Charitable Trust ev Orphanage Trust Case- তে তাঁকে ২০১৮ সালে দণ্ডিত করা হলেও পরবর্তীতে হাইকোর্ট ও সর্বোচ্চ আদালত রায় তুলে নিয়ে তাকে অব্যাহতি দেয়। এই ঘটনাটি না শুধু আইনি প্রক্রিয়া নিয়েই জড়িত ছিল, বরং রাজনৈতিক মুক্তি ও দমন-প্রশাসনের বিরোধেও তা গ্রহণযোগ্য।

তাই প্রশ্ন ওঠে যদি আসলেই এসব মামলার পেছনে সত্যিকারের দুর্নীতি প্রমাণ ছিল না, তাহলে বিচার ব্যবস্থা কি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে?

খালেদা জিয়ার মৃত্যু: নেত্রীর জীবন, রাজনীতি ও আইনি যুদ্ধ

খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন, দীর্ঘ অসুস্থতার পর। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে এবং যেন একটি রাজনৈতিক যুগের অবসান ঘটল। তার রাজনৈতিক জীবন ছিল উথাল-পাথাল, এবং মৃত্যুতে পুরো জাতি মর্মাহত। শুধু একটি রাজনৈতিক নেতা নয়, তিনি ছিলেন এক রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতীক; যিনি গণতন্ত্র, বিরোধী মতামত এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য লড়েছেন বহু বছর ধরে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ দিকে যেসব মামলা তার বিরুদ্ধে ছিল, সেগুলো নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। অনেক সমালোচক ও বিশ্লেষক মনে করে এগুলো ছিল রাজনৈতিক হয়রানি- বিচার ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে বিরোধী নেতাকে আইনজীবীদের দৌরাত্ম্যে নিঃস্ব করা হয়েছে।

একটি জাতির শোক- কিন্তু প্রশ্ন এখনও বেঁচে আছে

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশ একটা অভিভাবক, নেতা ও রাজনৈতিক প্রতীক হারিয়েছে। তাঁর মৃত্যু শুধু শোকের বিষয় নয়, এটা একটি রাজনৈতিক সময়ের সমাপ্তি ও নতুন অধ্যায়ের সূচনা। জীবনের শেষ সময়ে তাকে বাঁচাতে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে-  যা অনেক সময় বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং ন্যায়বিচার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত রাখা এবং রাজনৈতিক বিরোধিতাকে আইনি পদ্ধতির মাধ্যমে সম্মানজনকভাবে সমাধান করার প্রক্রিয়া জরুরি। আজ আমরা যখন তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করি, সেই সঙ্গে আমাদের বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংহতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও দৃঢ় করার জন্য collective introspection করা দরকার।

আজ যখন আমরা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে কাঁদি, আমাদের মনে প্রশ্নও জাগে: সেই একই সমাজ কি ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাজনীতিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে? খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ দিনের মামলা-সমূহ এবং সেগুলোর পরিণাম আজও বিতর্কের বিষয়। আইনের শাসন কি নিশ্চিত হলো, নাকি আইন ব্যবস্থাই রাজনৈতিক প্রতিদ্ব›িদ্বতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলো? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ভবিষ্যৎ বিএনপিসহ সমগ্র রাজনীতি এগিয়ে যাবে। আমাদের অতি দ্রুত এই দেশের বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। ন্যায়, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমাজ গড়তে হলে, আইনের শাসনকে রাজনৈতিক অভিসন্ধি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে।

বেগম খালেদা জিয়ার অবদান, সংগ্রাম ও সাফল্যের ইতিহাস আমাদের প্রজন্মের স্মৃতিতে থাকবে। কিন্তু শেষের দিনে তাঁর বিরুদ্ধে যেসব মামলা ছিল, সেগুলো নিয়ে আমাদের প্রশ্ন থাকতে পারে- বিচার কি সত্যিই স্বাধীন ছিল, নাকি রাজনৈতিক মঞ্চে একটি যুদ্ধ ক্ষুধায় আইনের আড়ালে খেলাধুলা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শুদ্ধ রক্ষণাবেক্ষণ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে খুঁজে পাওয়া উচিত।

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

বিএনপি

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর