সরকারি পোশাকের অপব্যবহার : টিকটক কনটেন্টে বিনোদন নাকি রাষ্ট্রের মর্যাদায় আঘাত?
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৭
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা চোখে পড়ছে- সরকারি পোশাক বা ইউনিফর্ম পরে ভিডিও ধারণ, টিকটক বানানো কিংবা বিভিন্ন বিনোদনমূলক কনটেন্ট প্রকাশ। কোথাও দেখা যাচ্ছে পুলিশ বা অন্য বাহিনীর পোশাক পরে তরুণদের অভিনয়, কোথাও আবার সরকারি পরিচয়ের আড়ালে হাস্যরসাত্মক কিংবা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। আরও ভয়াবহ হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই পোশাক পরা ব্যক্তিরা আদৌ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্য নন। প্রশ্ন উঠছে- এটি কি নিছক বিনোদন, নাকি রাষ্ট্রের মর্যাদার ওপর আঘাত? আর এর দায় কার?
সরকারি পোশাক কেবল একটি কাপড় নয়; এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও জনগণের আস্থার প্রতীক। পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব, ফায়ার সার্ভিস বা অন্যান্য বাহিনীর ইউনিফর্ম দেখেই মানুষ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার অনুভূতি পায়। সেই পোশাক যখন অনুমোদনহীনভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা শুধু আইন ভঙ্গই নয়, সামাজিক বিশ্বাসের সঙ্গেও প্রতারণা।
আইন অনুযায়ী, সরকারি পোশাক বা সরকারি কর্মচারীর পরিচয় ধারণ করা একটি স্পষ্ট অপরাধ। দণ্ডবিধিতে বলা হয়েছে, কেউ যদি সরকারি কর্মচারী সেজে নিজেকে উপস্থাপন করে বা সেই পরিচয়ে কোনো কাজ করে, তবে তা দণ্ডনীয়। অর্থাৎ কোনো সাধারণ ব্যক্তি যদি পুলিশের পোশাক পরে ভিডিও করে নিজেকে পুলিশ হিসেবে দেখায়, সেটি সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। তদুপরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, যা আরও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে প্রশ্ন শুধু আইন ভঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সামাজিক প্রভাব আরও গভীর। তরুণ প্রজন্ম যখন দেখে, সরকারি পোশাক পরে হাসি-ঠাট্টা বা ‘ভিউ’ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন তাদের কাছে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব তুচ্ছ হয়ে ওঠে। ইউনিফর্মের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত, তা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়। এতে ভবিষ্যতে আইন মানার প্রবণতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এক্ষেত্রে দায়িত্বের প্রশ্নটি বহুমাত্রিক। প্রথম ও প্রধান দায় অবশ্যই সেই ব্যক্তির, যিনি অনুমতি ছাড়া সরকারি পোশাক ব্যবহার করছেন। তিনি জানুন বা না জানুন- আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা কখনোই অপরাধের অজুহাত হতে পারে না। সামাজিক মাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হওয়ার লোভে যদি কেউ রাষ্ট্রের প্রতীককে অপব্যবহার করে, তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই স্বাভাবিক।
দ্বিতীয়ত, দায়িত্ব আসে সরকারি পোশাকের সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও। কীভাবে সহজেই বাজারে সরকারি বাহিনীর পোশাক পাওয়া যায়- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। যদি অবাধে এসব পোশাক বিক্রি হয় এবং তা নজরদারির বাইরে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতাও আলোচনায় আসবে। ইউনিফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে অপব্যবহার বন্ধ করা কঠিন।
আরও সংবেদনশীল বিষয় হলো, যদি কোনো প্রকৃত সরকারি কর্মচারী নিজেই ইউনিফর্ম পরে টিকটক বা ভিডিও বানান। এক্ষেত্রে বিষয়টি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ নাও হতে পারে, কিন্তু তা স্পষ্টতই শৃঙ্খলাভঙ্গ। কর্মরত অবস্থায়, কিংবা ইউনিফর্মের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে কনটেন্ট তৈরি করা বাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমন আচরণ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জনগণের আস্থায় চিড় ধরায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে প্রত্যেকেই যেন নিজেকে অভিনেতা বা নির্মাতা ভাবছে। কিন্তু সব কিছুরই একটি সীমা থাকা জরুরি। সরকারি পোশাক সেই সীমার মধ্যেই পড়ে। কারণ এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের সম্পদ এবং জনগণের বিশ্বাসের প্রতীক। এটিকে বিনোদনের উপকরণ বানানো মানে রাষ্ট্রের গুরুতর বিষয়কে হালকাভাবে উপস্থাপন করা।
এই প্রবণতা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মাঝে মাঝে দু’একটি ভিডিও দেখে ব্যবস্থা নিলেই চলবে না। একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা ও ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন। সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া সরকারি পরিচয় ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি হলে দ্রুত তা শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত সদস্যদের জন্যও স্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে- কী করা যাবে, কী করা যাবে না।
সচেতনতার অভাবও এখানে বড় কারণ। অনেকেই মনে করেন, “এটা তো শুধু ভিডিও”- কিন্তু তারা বোঝেন না, এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। একটি ভুয়া ভিডিও দেখে কেউ প্রতারিত হলে, কিংবা অপরাধীরা যদি সরকারি পরিচয়ের আড়ালে অপকর্ম চালায়, তখন তার দায় কার? তাই স্কুল, কলেজ ও সামাজিক পর্যায়ে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা জরুরি।
সরকারি পোশাক পরে ভিডিও ধারণ বা টিকটক করা কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়। এটি আইন, শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ব্যক্তি যদি দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করে, প্রশাসন যদি নজরদারিতে গাফিলতি দেখায়, আর সমাজ যদি এটিকে ‘মজা’ বলে এড়িয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হবে সবাইকে।
রাষ্ট্রের প্রতীককে সম্মান করা নাগরিক দায়িত্ব। সরকারি পোশাকের অপব্যবহার রোধে এখনই কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। নইলে সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তের বিনোদনের মূল্য দিতে হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থাহীনতা ও শৃঙ্খলার অবক্ষয়ের মাধ্যমে।
বিকেপি/এমবি

