দেনমোহর মুসলিম বিবাহব্যবস্থার একটি মৌলিক ও অপরিহার্য উপাদান। এটি কোনো উপহার নয়, বরং স্বামীর ওপর স্ত্রীর একটি আইনস্বীকৃত অধিকার। বাংলাদেশে পারিবারিক বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমায় দেনমোহর সংক্রান্ত প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে। বিশেষ করে একটি প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, বিবাহের পরপরই কি স্ত্রী দেনমোহর দাবি করতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন ও প্রচলিত বিচারিক ব্যাখ্যার দিকে তাকাতে হয়।
মুসলিম আইনে দেনমোহর (মাহর) হলো বিবাহের চুক্তির বিনিময়ে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর প্রতি আরোপিত একটি আর্থিক দায়। এটি কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত এবং স্ত্রী চাইলে তা আইনগতভাবে আদায় করতে পারেন। দেনমোহর নির্ধারিত না হলেও বিবাহ বাতিল হয় না; সেক্ষেত্রে স্ত্রী উপযুক্ত দেনমোহর (মাহর মিসল) পাওয়ার অধিকারী হন। অর্থাৎ দেনমোহর মুসলিম বিবাহের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মুসলিম আইনে দেনমোহর সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত- ত্বরিত (Prompt Dower) ও বিলম্বিত (Deferred Dower)। ত্বরিত দেনমোহর হলো সেই অংশ, যা স্ত্রী দাবি করলে স্বামীকে তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে হয়। আর বিলম্বিত দেনমোহর সাধারণত তালাক, মৃত্যু বা বিবাহ বিচ্ছেদের সময় পরিশোধযোগ্য হয়, যদি কাবিননামায় ভিন্ন কিছু উল্লেখ না থাকে।
আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পরপরই স্ত্রী তার ত্বরিত দেনমোহর দাবি করতে পারেন। এক্ষেত্রে দাম্পত্য জীবন শুরু হয়েছে কি না, বা সহবাস হয়েছে কি না-
তা বাধ্যতামূলক শর্ত নয়। এমনকি বিবাহের দিনই স্ত্রী দেনমোহর দাবি করলে তা আইনসঙ্গত। স্বামী যদি ত্বরিত দেনমোহর পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাহলে স্ত্রী বৈবাহিক অধিকার স্থগিত রাখতে পারেন- এমনকি সহবাসে অস্বীকৃতি জানানোর অধিকারও মুসলিম আইন স্বীকার করে।
দেশের আদালতের বিভিন্ন রায়েও এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আদালত বারবার বলেছেন, ত্বরিত দেনমোহর হলো স্ত্রীর তাৎক্ষণিক পাওনা। স্বামী আর্থিক অক্ষমতার অজুহাত দেখিয়ে এই দায় এড়াতে পারেন না। দেনমোহর কোনো দান নয়, এটি একটি আইনগত দেনা (debt)। ফলে স্ত্রী চাইলে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে তা আদায় করতে পারেন।
তবে বাস্তবতায় অনেক নারী এই অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। সামাজিক চাপ, পারিবারিক প্রভাব কিংবা ভুল ধারণার কারণে অনেকেই মনে করেন- দেনমোহর কেবল তালাকের সময় দাবি করা যায়। এই ভুল ধারণা নারীদের আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে স্বামী পক্ষ দেনমোহরকে কাগজে-কলমে রেখে বাস্তবে পরিশোধ না করেই দীর্ঘদিন পার করে দেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কাবিননামায় যদি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকে কোন অংশ ত্বরিত আর কোন অংশ বিলম্বিত, তাহলে কী হবে? মুসলিম আইন অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে পুরো দেনমোহরকেই সাধারণত ত্বরিত দেনমোহর হিসেবে গণ্য করা হয়, যদি না পরিস্থিতি ও প্রমাণ থেকে ভিন্ন কিছু প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ স্ত্রী চাইলে পুরো দেনমোহর একসঙ্গে দাবি করতে পারেন।
এখানে কাবিননামার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেনমোহরের পরিমাণ, পরিশোধের ধরন এবং সময়- সবকিছু স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলে ভবিষ্যতে বিরোধের সম্ভাবনা কমে যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে কাবিননামা পূরণ করা হয় আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে, আইনগত গুরুত্ব না বুঝেই। এর ফলে পরবর্তীতে নারীকে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে যেতে হয়।
দেনমোহর আদায়ে বিলম্ব শুধু ব্যক্তিগত অন্যায় নয়; এটি সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতিফলন। মুসলিম আইন যেখানে নারীর আর্থিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়েছে, সেখানে তার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া আইন ও সমাজ-উভয়ের ব্যর্থতা। দেনমোহর নারীর মর্যাদা ও স্বাধিকার রক্ষার একটি মাধ্যম, এটি অবহেলা করার সুযোগ নেই।
মুসলিম আইন অনুযায়ী বিবাহের পরপরই স্ত্রী ত্বরিত দেনমোহর দাবি করতে পারেন, এবং এটি সম্পূর্ণ আইনসম্মত। এই অধিকার বাস্তবায়নে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, কাবিননামা সম্পর্কে সচেতনতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। দেনমোহরকে বোঝা নয়, বরং ন্যায়বিচার ও দায়িত্বের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করলেই মুসলিম বিবাহব্যবস্থার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে।
বিকেপি/এমবি

