হুকুমের আসামি : আইন ও ভুল ধারণা
অ্যাড. কে এম খায়রুল কবীর
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২৮
আইন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে একটি বহুল আলোচিত কিন্তু কম বোঝা শব্দ হলো `হুকুমের আসামি'। অনেক সময় শোনা যায়, অপরাধ প্রমাণিত হলে হুকুমের আসামির নাকি বিয়ে হয়ে যায়। এই ধারণা কতটা সত্য, আর আইন আসলে কী বলে- সেটাই পরিষ্কার করা জরুরি।
সহজ ভাষায়, হুকুমের আসামি হলো এমন একজন ব্যক্তি যিনি মামলার প্রাথমিক এজাহারে (এফআইআর) আসামি ছিলেন না, কিন্তু বিচার চলাকালে আদালতের কাছে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত নিজ উদ্যোগে বা আবেদনের পর তাকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ আদালতের হুকুম বা আদেশে তিনি আসামি হন- এই কারণেই তাকে হুকুমের আসামি বলা হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুকুমের আসামি হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। এটি কেবল বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি ধাপ।
অপরাধ প্রমাণিত হলে কি বিয়ে হয়?
এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি কাজ করে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো অপরাধের শাস্তি হিসেবে বিয়ে দেওয়ার বিধান নেই। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি নির্ধারিত হয় দণ্ডবিধি ও সংশ্লিষ্ট আইনের আলোকে- যেমন কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয়ই।
তবে সমাজের কিছু অংশে বা গ্রাম্য সালিশে মাঝে মাঝে দেখা যায়, সামাজিক চাপ বা আপসের নামে বিয়ের মতো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। এগুলো আইনসম্মত নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর অধিকার লঙ্ঘন করে। আদালতের রায়ের সঙ্গে এসব সামাজিক সিদ্ধান্তের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।
কেন এই ভুল ধারণা ছড়ায়?
আইনি জ্ঞানের অভাব, গুজব, সামাজিক রীতি এবং কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা থেকে এমন ধারণা তৈরি হয় যে আদালত নাকি বিয়েকে শাস্তি হিসেবে ব্যবহার করে। বাস্তবে আদালতের কাজ হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, সামাজিক চাপকে বৈধতা দেওয়া নয়।
হুকুমের আসামি একটি আইনি পরিভাষা, শাস্তির ধরন নয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হবে আইনের আলোকে, কোনো সামাজিক বা অপ্রাসঙ্গিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নয়। তাই আইন নিয়ে কথা বলার সময় গুজব নয়, বরং সঠিক তথ্য জানা ও ছড়ানোই হওয়া উচিত। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আইনকে আইন হিসেবেই দেখা, আর ভুল ধারণার বিরুদ্ধে যুক্তি ও জ্ঞান দিয়ে দাঁড়ানো।
বিকেপি/এনএ

