Logo

আইন ও বিচার

দলিল-পর্চা সংশোধন : নাগরিক অধিকার সুরক্ষার অপরিহার্য পথ

Icon

আইন ও আদালত ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৪

দলিল-পর্চা সংশোধন : নাগরিক অধিকার সুরক্ষার অপরিহার্য পথ

ভূমি বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর একটি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা ও বিরোধ আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে দলিল ও পর্চায় ভুল, অসঙ্গতি কিংবা জালিয়াতি। নামের বানান ভুল থেকে শুরু করে দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর, জমির পরিমাণ কিংবা মালিকানা সংক্রান্ত তথ্যের গরমিল- এসব কারণে অসংখ্য মানুষ বছরের পর বছর মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ছেন। এই প্রেক্ষাপটে দলিল ও পর্চা সংশোধনের আইনগত পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

দলিল ও পর্চা সংশোধন বলতে কী বোঝায়

দলিল সংশোধন বলতে মূলত নিবন্ধিত দলিলে থাকা ভুল তথ্য সংশোধন করাকে বোঝায়। অন্যদিকে পর্চা বা খতিয়ান সংশোধন হলো ভূমি রেকর্ডে (সি.এস., এস.এ., আর.এস., বিএস, বা ডিজিটাল খতিয়ান) বিদ্যমান ভুল তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়া। এই ভুল ইচ্ছাকৃত না হলেও ভবিষ্যতে তা বড় ধরনের আইনগত জটিলতার জন্ম দিতে পারে।

দলিল সংশোধনের আইনগত পদ্ধতি

নিবন্ধিত দলিলে ভুল থাকলে সাধারণভাবে দুটি পথ খোলা থাকে।

প্রথমত, সংশোধনী দলিল (Rectification Deed)। যদি দলিলের পক্ষগণ জীবিত থাকেন এবং ভুলটি অনিচ্ছাকৃত ও স্বীকৃত হয়, তবে সংশোধনী দলিল রেজিস্ট্রি করা যায়। এতে ভুল অংশ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে সঠিক তথ্য লিপিবদ্ধ করতে হয়। এই সংশোধনী দলিলও মূল দলিলের মতোই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নিবন্ধন করতে হয় এবং যথাযথ স্ট্যাম্প ও রেজিস্ট্রেশন ফি প্রযোজ্য হয়।

দ্বিতীয়ত, আদালতের শরণাপন্ন হওয়া। 

যদি দলিলের কোনো পক্ষ মারা যান, অথবা অন্য পক্ষ সংশোধনে সম্মত না হন, তাহলে দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করতে হয়। সাধারণত Specific Relief Act অনুযায়ী ‘দলিল সংশোধন মামলা’ (Suit for Rectification of Deed) করা হয়। আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে ভুল প্রমাণিত হলে সংশোধনের আদেশ প্রদান করেন।

পর্চা বা খতিয়ান সংশোধনের পদ্ধতি

পর্চা সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও বিচারিক- উভয় পথই বিদ্যমান। প্রথম ধাপ হলো ভূমি অফিসে আবেদন। সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস বা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়। আবেদনের সঙ্গে দলিল, পূর্ববর্তী খতিয়ান, নামজারি কাগজ, খাজনার রসিদসহ প্রাসঙ্গিক দলিল সংযুক্ত করতে হয়।

দ্বিতীয় ধাপে শুনানি ও তদন্ত। ভূমি কর্মকর্তা আবেদন গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষদের নোটিশ প্রদান করেন এবং শুনানির দিন নির্ধারণ করেন। প্রয়োজনে মাঠ পর্যায়ে তদন্ত (লোকাল ইনকোয়ারি) করা হয়।

তৃতীয় ধাপে আদেশ প্রদান। প্রমাণের ভিত্তিতে ভুল প্রমাণিত হলে খতিয়ান সংশোধনের আদেশ দেওয়া হয়। তবে মনে রাখতে হবে, ভূমি অফিস কেবল রেকর্ডগত ভুল সংশোধন করতে পারে; মালিকানা সংক্রান্ত জটিল বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা তাদের নেই।

আদালতের ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা

যদি পর্চা সংশোধন নিয়ে জটিল বিরোধ থাকে- যেমন মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব, জাল দলিলের অভিযোগ বা একাধিক দাবিদার- তাহলে দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক মামলা (Declaratory Suit) দায়ের করতে হয়। আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই পরবর্তীতে রেকর্ড সংশোধন সম্ভব হয়। তবে আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও খরচ সাধারণ মানুষের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সচেতনতার অভাব ও এর ফলাফল

অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ ভুল বুঝে বা অজ্ঞতার কারণে অনানুষ্ঠানিকভাবে সংশোধনের চেষ্টা করেন, যা পরবর্তীতে আরও বড় সমস্যার সৃষ্টি করে। আবার দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে কেউ কেউ অবৈধ পথে রেকর্ড পরিবর্তনের চেষ্টা করেন, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

কী করা প্রয়োজন

প্রথমত, ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো লেনদেনের আগে দলিল ও পর্চা ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ভুল ধরা পড়লে দ্রুত আইনসম্মত পথে সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। তৃতীয়ত, সরকারিভাবে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে ভুলের পরিমাণ কমে এবং সংশোধন প্রক্রিয়া সহজ হয়। চতুর্থত, সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ভাষায় নির্দেশিকা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। 

দলিল ও পর্চা সংশোধন কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং নাগরিকের আইনগত অধিকার। সঠিক ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে এই সংশোধন নিশ্চিত করা গেলে ভূমি বিরোধ কমবে, আদালতের চাপ হ্রাস পাবে এবং সর্বোপরি জনগণের আস্থা বাড়বে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দলিল-পর্চা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করা এখন সময়ের দাবি।

বিকেপি/এনএ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইনি প্রশ্ন ও উত্তর আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন