অবৈধ অস্ত্রের ছায়ায় দেশ, সাঁড়াশি অভিযানের বিকল্প নেই
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১৬
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ বিস্তার, শিশু ও কিশোরদের হাতে অস্ত্র দেখা যাওয়া এবং কিশোর গ্যাংয়ের লাগামহীন অপরাধ প্রবণতা জাতির জন্য এক অশনিসংকেত। সাধারণ মানুষের মনে আজ নিরাপত্তাহীনতা, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা গভীরভাবে বাসা বেঁধেছে। এই পরিস্থিতিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও তৎপর হওয়া শুধু জরুরি নয়, বরং সময়ের দাবি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই অবৈধ অস্ত্রের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে আসা আগ্নেয়াস্ত্র, স্থানীয়ভাবে তৈরি দেশি অস্ত্র এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লুকিয়ে থাকা অস্ত্রভাণ্ডার মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো- এই অস্ত্র এখন আর কেবল পেশাদার অপরাধীদের হাতে সীমাবদ্ধ নেই; স্কুলপড়ুয়া শিশু, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এবং রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা তরুণদের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যাচ্ছে।
রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে কিশোর গ্যাং এখন একটি ভয়ংকর সামাজিক বাস্তবতা। তারা চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, এলাকা দখল ও হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের অনেকেই রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে নিজেদের রক্ষা করছে। কোথাও তারা ছাত্রনেতা, কোথাও দলীয় কর্মী- এই পরিচয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতকেও অনেক সময় বাঁধা দিয়ে রাখছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার হলেও প্রভাবশালী মহলের চাপ, রাজনৈতিক সুপারিশ কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অভিযুক্তরা দ্রুতই জামিনে বেরিয়ে আসে। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ভাবছে, আইন কি সবার জন্য সমান?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো শিশুদের হাতে অস্ত্র। সমাজে যখন একটি শিশু আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ছবি তোলে বা এলাকায় ‘ভয়ংকর’ হিসেবে পরিচিত হয়, তখন তা কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতাই নয়, সামাজিক অবক্ষয়েরও প্রতিচ্ছবি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্র- সবখানেই যেন একসঙ্গে ব্যর্থতা প্রকাশ পাচ্ছে। একটি প্রজন্ম যদি অস্ত্রকে ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখে বড় হয়, তবে ভবিষ্যৎ সমাজ কতটা নিরাপদ হবে, সে প্রশ্ন এড়ানোর উপায় নেই।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্যই একেবারে নিষ্ক্রিয় নয়। মাঝেমধ্যে অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ও অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ অনেক সময় বিচ্ছিন্ন ও প্রতিক্রিয়াশীল। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, অথচ প্রতিরোধমূলক ও গোয়েন্দাভিত্তিক ধারাবাহিক সাঁড়াশি অভিযান খুব একটা দেখা যায় না। এলাকায় এলাকায় একযোগে, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অভিযান না হলে অবৈধ অস্ত্রের মূল উৎস ও পৃষ্ঠপোষকতাকে ভাঙা সম্ভব নয়।
এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের ভেতরেই অস্ত্রধারী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা। দলীয় পরিচয়ে কেউ অপরাধ করলে তাকে রক্ষা করা মানেই অপরাধকে বৈধতা দেওয়া। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তবে প্রায়ই উল্টো চিত্র দেখা যায়। এতে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অনেক সময় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, অনেক এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের গুদাম থাকার তথ্য থাকলেও অভিযান চালাতে গড়িমসি করা হয়। কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো ‘উপরে কথা আছে’- এই অদৃশ্য দেয়াল আইন প্রয়োগের পথে বড় বাধা। ফলে অস্ত্র উদ্ধার না হয়ে অপরাধীরা আগেভাগেই সতর্ক হয়ে যায়। এই চক্র ভাঙতে হলে বাহিনীর স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
সাধারণ মানুষ আজ আতঙ্কে আছে। সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হতে ভয় পায়, সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হলে বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সে দায়িত্বে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।
এখন সময় এসেছে এলাকাভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি সাঁড়াশি অভিযান চালানোর। শুধু অস্ত্র উদ্ধার নয়, অস্ত্রের উৎস, অর্থায়ন, পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাজনৈতিক সংযোগ- সবকিছুকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শিশু ও কিশোরদের জন্য পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করা জরুরি, যাতে তারা অপরাধের পথে না যায়।
পরিশেষে বলতে হয়, অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার দায়িত্ব নয়। এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। তবে নেতৃত্ব দিতে হবে রাষ্ট্রকেই। রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় ছত্রছায়া কিংবা ক্ষমতার প্রভাব- কিছুই যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে। অন্যথায় অবৈধ অস্ত্রের এই ছায়া আরও দীর্ঘ হবে, আর তার নিচে চাপা পড়বে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখতে হলে এখনই দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান, এলাকায় এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান এবং আইনের শাসনের বাস্তব প্রয়োগই পারে এই অন্ধকার থেকে দেশকে বের করে আনতে।

