নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা
অ্যাডভোকেট মাকসুদা বেগম
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৪
নারী নির্যাতন আজ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুতর সামাজিক ও আইনগত চ্যালেঞ্জ। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট কিংবা ডিজিটাল পরিসর- কোথাও নারী পুরোপুরি নিরাপদ নয়। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নারী নির্যাতনের ঘটনায় মামলা বৃদ্ধির পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না। আদালতে মামলা দায়ের হলেও উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বহু নারী নির্যাতনের মামলা খারিজ হয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক সচেতনতার ঘাটতিকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে।
আইনজীবী হিসেবে বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হলেও প্রথমে বিষয়টি গোপন রাখেন- পারিবারিক চাপ, সামাজিক ভয়, সম্মানহানির আশঙ্কা কিংবা আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে। ফলে যখন মামলা দায়ের করা হয়, তখন প্রয়োজনীয় আলামত, মেডিকেল রিপোর্ট বা সাক্ষ্য আর পাওয়া যায় না। অথচ আইনের ভাষায়, অপরাধ প্রমাণের দায় রাষ্ট্রের হলেও বাস্তবে ভুক্তভোগীকেই প্রমাণ সংগ্রহে বড় ভূমিকা রাখতে হয়।
এখানে সচেতনতার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী কখন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, কোন আচরণটি অপরাধের আওতাভুক্ত এবং কীভাবে আইনগত সহায়তা নিতে হবে- এই মৌলিক বিষয়গুলো জানা না থাকলে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যৌন হয়রানি, কটূক্তি, অশালীন ইঙ্গিত, জোরপূর্বক স্পর্শ, অনলাইন হুমকি বা মানহানি- এসবই ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু অনেক নারী এখনো এসবকে “সহ্য করার বিষয়” মনে করে চুপ থাকেন।
সাম্প্রতিক সময়ে নারী নির্যাতন নিয়ে আলোচনায় পোশাক, চলাফেরা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের উপস্থিতি নিয়ে নানা মত উঠে আসে। এখানে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে দেখা জরুরি। আইন কখনোই নারীর পোশাক বা জীবনযাপনকে অপরাধের কারণ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। অপরাধের জন্য একমাত্র দায়ী অপরাধী নিজেই। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য, সামাজিক বাস্তবতায় নিরাপত্তা ও ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে নারীদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন- যেমন ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা। এই সতর্কতা অপরাধকে বৈধতা দেয় না, বরং আত্মসুরক্ষার একটি বাস্তব কৌশল মাত্র।
ডিজিটাল যুগে নারী নির্যাতনের একটি বড় অংশ ঘটছে অনলাইনে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নারীরা সক্রিয়ভাবে মত প্রকাশ করছেন, যা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু একই সঙ্গে সাইবার বুলিং, মানহানি, ভুয়া আইডি দিয়ে হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের ঘটনাও বাড়ছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, অনেক ভুক্তভোগী জানেন না যে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার রয়েছে এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করলেই মামলা শক্তিশালী করা সম্ভব।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, দণ্ডবিধি এবং সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত আইন- দেশে আইনের কোনো অভাব নেই। সমস্যা মূলত প্রয়োগ ও প্রমাণে। মামলা দায়েরের পর সঠিক তদন্ত না হওয়া, সাক্ষী ভয় পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিচার বিলম্বিত হওয়া- এসবই ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে এবং ভুক্তভোগীরা আরও নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধে তাই কেবল আইন থাকাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং প্রমাণ সংগ্রহে পেশাদার সহায়তা। থানায় অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত ও বিচার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নারীকে আইনগত সহায়তা ও বিনামূল্যের আইনি পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ আরও সহজ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিকতার পরিবর্তন। নারী নির্যাতন কোনো “নারী সমস্যা” নয়; এটি একটি সামাজিক অপরাধ। পুরুষদের দায়িত্বশীল আচরণ, পারিবারিক শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে কেবল নারীর ওপর দায় চাপিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
একজন নারী আইনজীবী হিসেবে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই- নারীকে নিয়ন্ত্রণ করে নয়, বরং আইন প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেই নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব। নিরাপদ সমাজ গড়তে হলে নারীকে ভয় নয়, আইনের শক্তিতে বিশ্বাসী করে তুলতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলেই কেবল অপরাধ কমবে, আর তখনই আমরা একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

