সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়া
শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধ ও সেনা আইনে শাস্তি
আইন ও আদালত ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৫
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল, নিয়মানুবর্তী ও পেশাদার বাহিনী। এখানে শৃঙ্খলা শুধু নৈতিক মূল্যবোধ নয়, এটি একটি কঠোর আইনগত বাধ্যবাধকতা। এই বাহিনীর প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত। তাই কোনো সেনা সদস্য যদি অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করেন, পালিয়ে যান বা দরখাস্ত ছাড়া অনুপস্থিত থাকেন, তাকে সাধারণ অনুপস্থিতি হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি একটি গুরুতর সামরিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হয় The Army Act, ১৯৫২ (বাংলাদেশে প্রযোজ্য) এবং অৎসু জঁষবং অনুযায়ী। এই আইনে "Desertion" (পলায়ন) এবং "Absence without leave" (অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতি) স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত।
সেনা আইনের দৃষ্টিতে, যদি কোনো সেনা সদস্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ইউনিট, কর্মস্থল বা দায়িত্বস্থল ত্যাগ করেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরে না আসেন, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। বিশেষ করে যদি তার উদ্দেশ্য হয় স্থায়ীভাবে বাহিনী ত্যাগ করা, তাহলে সেটিকে পলায়ন (Desertion) হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা আরও গুরুতর অপরাধ।
Army Act, ১৯৫২-এর ধারা ৩৯ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন, দায়িত্ব পালনের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে অনুপস্থিত থাকেন, বা যুদ্ধকালীন সময়ে ইউনিট ত্যাগ করেন, তাহলে তিনি পলায়নের অপরাধে অভিযুক্ত হবেন। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে কারাদণ্ড, সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত, এমনকি বিশেষ পরিস্থিতিতে কঠোর দণ্ডের বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে, যদি কোনো সেনা সদস্য সাময়িকভাবে অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকেন, কিন্তু তার পলায়নের স্থায়ী উদ্দেশ্য প্রমাণিত না হয়, তাহলে তা ধারা ৩৮ অনুযায়ী "অননুমোদিত অনুপস্থিতি" হিসেবে গণ্য হয়। এ ক্ষেত্রেও শাস্তি লঘু হলেও তা অপরাধই বটে। শান্তির মধ্যে থাকতে পারে- সামরিক কারাদণ্ড, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা কর্তন, পদাবনতি, অথবা বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুতি।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, যুদ্ধকালীন সময়ে বা জরুরি পরিস্থিতিতে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করলে শাস্তি আরও কঠোর হয়। কারণ তখন একজন সেনা সদস্যের অনুপস্থিতি শুধু শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সেনা আইনে আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো সদস্য দরখাস্ত (Resignation) ছাড়া নিজ ইচ্ছায় চলে যান, তবে তার বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে বিচার অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেনাবাহিনীতে চাকরি ত্যাগ করা একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়া আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।
এ ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় Court Martial-এর মাধ্যমে। অভিযুক্ত সেনা সদস্য আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান, সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ করা হয় এবং দোষ প্রমাণিত হলে শাস্তি প্রদান করা হয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক বিচারব্যবস্থা, যা সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষার অন্যতম ভিত্তি।
এই কঠোর আইনের পেছনে যুক্তি স্পষ্ট। সেনাবাহিনী কোনো সাধারণ কর্মস্থল নয়। এখানে একজন সদস্যের দায়িত্ব অবহেলা বা অনুপস্থিতি অন্য সদস্যদের জীবন, অপারেশন এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই ব্যক্তিগত সমস্যা, মানসিক চাপ বা পারিবারিক সংকট থাকলেও তা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অজুহাত হতে পারে না। বরং এসব ক্ষেত্রে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ছুটি, পোস্টিং পরিবর্তন বা প্রশাসনিক সহায়তা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে এটাও সত্য, সেনা সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য, কর্মচাপ ও পারিবারিক সমস্যার প্রতি যথাযথ দৃষ্টি দেওয়াও রাষ্ট্র ও বাহিনীর নৈতিক দায়িত্ব। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের চাপ, অবহেলা বা যোগাযোগের অভাবে কেউ চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। তাই শান্তির পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, কাউন্সেলিং ও মানবিক ব্যবস্থাপনাও জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়া বা দরখাস্ত ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করা সেনা আইনে গুরুতর অপরাধ এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। শৃঙ্খলাই সেনাবাহিনীর শক্তি- এটি দুর্বল হলে বাহিনীর কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা, মানবিক ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের সমন্বয়ই পারে এই ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনতে এবং একটি শক্তিশালী, পেশাদার সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে।

