Logo

আইন ও বিচার

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নের অন্তরায় ও উত্তরণের পথ

Icon

শাহ বিলিয়া জুলফিকার

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১১

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নের অন্তরায় ও উত্তরণের পথ

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে পরিবহণ খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে, বিশেষত সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরতে, সরকার ২০১৮ সালে সড়ক পরিবহণ আইন প্রণয়ন করে। আইনটি প্রণীত হওয়ার পেছনে রয়েছে এক শোকাবহ প্রেক্ষাপট।

নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহনের নির্মম বলি হয়ে যখন তরুণ প্রাণ অকালে ঝরে পড়ে, তখনই রাষ্ট্র নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়। কিন্তু কঠোর বিধানের পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়ন যে এক দুরূহ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, তা তখনও বোধগম্য ছিল না। ২০১৮ সালের ২১ জুলাই বেপরোয়া বাসচালকের হন দুই করিম খানম

ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে অসতর্কতার শিকার শিক্ষার্থী আব্দুল রাজিব এবং দিয়া মীম। তারা শহিদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিল। সেই ঘটনার পর পুরো দেশজুড়ে প্রতিবাদের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে, চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করা থেকে শুরু করে যানবাহনের শৃঙ্খলা ফেরাতে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই আন্দোলন শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোড়ন তোলে।

সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয় এবং সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮ পাস করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, পরিবহণ খাতে শৃঙ্খলা তৈরি করা, চালক, যাত্রী ও পরিবহণ মালিকদের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে, আইনটি পাস হলেও, এর কার্যকর প্রয়োগ এখনও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর মাধ্যমে বেশ কিছু কঠোর বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের ধারা ১৪ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালান, তবে ধারা ৭১ অনুসারে তার ১ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এটি সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর বাস্তবায়নে প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাব লক্ষ্য করা যায়।

আইনের ধারা ১৬ অনুযায়ী, প্রত্যেক যানবাহনের নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক, অন্যথ যায় ধারা ৭২ অনুসারে ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে

আইনের ধারা ১৬ অনুযায়ী, প্রত্যেক যানবাহনের নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক, অন্যথ বাংলার খবার ধারা ৭২ অনুসারে

মাসের কারাদণ্ড বা ৫০,০০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া, ধারা ১৭ অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি মিথ্যা নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করেন, তবে ধারা ৭৩ অনুসারে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা হতে পারে। তবে বাস্তবে মিথ্যা নিবন্ধন শনাক্তকরণে প্রশাসনিক জটিলতা

আইনটির কার্যকারিতা সীমিত করে তুলেছে। ধারা ৩৪ অনুযায়ী, গণপরিবহণে নারী, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট আসন সংরক্ষণের নির্দেশনা রয়েছে। যদি কেউ এই বিধান লঙ্ঘন করেন, তবে ধারা ৮০ অনুসারে ১ মাসের কারাদণ্ড বা ১০,০০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড এবং চালকের জন্য অতিরিক্তভাবে ১ পয়েন্ট কর্তনের বিধান রয়েছে।

যদিও এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে বাস্তবে প্রশাসনিক অস্পষ্টতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। ধারা ৪৪ অনুযায়ী, অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া গাড়ি চালানো একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ধারা ৮৭ অনুসারে এর সর্বোচ্চ শাস্তি ৩ মাসের কারাদণ্ড বা ১০,০০০ টাকা জরিমানা। কিন্তু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; চালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা বাড়াতে প্রয়োজন বৃহত্তর সচেতনতা ও ট্র্যাফিক আইন সম্পর্কিত শিক্ষা ।

এছাড়া ধারা ৬২ অনুসারে, যদি কোনো চালক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হন, তবে ধারা ৯৫ অনুসারে তার ১ মাসের কারাদণ্ড অথবা ২০,০০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে প্রশাসনিক অবহেলা ও জনগণের অজ্ঞতা এই বিধান কার্যকর করতে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইন আছে, বিধানও কঠোর, কিন্তু বাস্তবতায় তার প্রতিফলন যেন মরীচিকার মতো। যতবারই সড়কে রক্ত ঝরে, ততবারই প্রশ্ন জাগে- এই আইন কি শুধু কাগজে লেখা শব্দ? নাকি এরও আছে শেকলে বাঁধা এক নিয়তি? বাস্তবায়নের পথে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য অন্তরায়, যেগুলো না কাটিয়ে আইনের শক্তি শুধু নাম মাত্রই থেকে যাবে।

সড়কের গতি ঠিক রাখার জন্য শুধু চালকের সতর্কতা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সুষ্ঠু অবকাঠামো। কিন্তু আমাদের দেশে সড়ক ব্যবস্থাপনা এখনও অনেক ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত। পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই, সংকীর্ণ রাস্তায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, অপর্যাপ্ত ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা-সব মিলিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা যেন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। আইন বাস্তবায়ন করতে চাইলে, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, বরং সড়ক অবকাঠামোকে আধুনিক ও পরিকল্পিত করে তুলতে হবে।

সম্প্রতি আমি এবং আমার দল অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার অংশ হিসেবে ময়মনসিংহ শহরে সড়ক পরিবহণ আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে কী না সে বিষয় ফিল্ড ওয়ার্ক করেছিলাম। সেজন্য ময়মনসিংহে চালক, পথচারী, ট্র্যাফিক পুলিশ, বাস কনড্রাক্টর সহ মোট ২০০ জনের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এ পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, ৬৬.৬৭% প্রতিক্রিয়া দেওয়া ব্যক্তি বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী, আর ৩৩.৩৩% বৈধ লাইসেন্স ধারণ করেন না।

একটি উল্লেখযোগ্য ৪০% প্রতিক্রিয়া প্রদানকারী জানান যে, তারা যে যানবাহনগুলো পর্যবেক্ষণ করেছেন, সেগুলো আইনি আসন সংখ্যার সাথে মিলিত ছিল না। ৩৭% প্রতিক্রিয়া প্রদানকারী আইনি আসন সংখ্যা বা ভাড়া কাঠামো সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি, যা হয়ত সচেতনতার অভাব অথবা বিষয়টির প্রতি সাধারণ উদাসীনতার পরিচায়ক। মাত্র ২৩% প্রতিক্রিয়া প্রদানকারী নিশ্চিত করেছেন যে তারা যেসব যানবাহন পর্যবেক্ষণ করেছেন, সেগুলো আইনি আসন সংখ্যা এবং ভাড়া কাঠামো উভয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল ।

একটি বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ (৮০%) প্রতিক্রিয়া প্রদানকারী জানান যে তারা গতির সীমা মেনে চলেন, যা সড়ক ট্র্যাফিক বিধি মেনে চলার একটি ইতিবাচক প্রবণতা নির্দেশ করে। অন্যদিকে, ২০% প্রতিক্রিয়া প্রদানকারী জানিয়েছেন যে তারা গতির সীমা অনুসরণ করেন না, যা আরও শক্তিশালী আইন প্রয়োগ এবং সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা বোঝায়। গবেষণার মাধ্যমে আমরা দেখতে পেয়েছি যে অনেক সিএনজি চালক বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সের অভাব সত্ত্বেও নিয়ম ভেঙে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন । এই অনিয়ম প্রধানত দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং পুলিশের দ্বারা বারবার হয়রানির ফলস্বরূপ ।

পরিবহণ খাতে সুষ্ঠু ও নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করতে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহণ আইনের একটি সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেছে। তবে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘ পথের ধাপ, যেখানে শুধু আইনগত কাঠামো নয়, জনগণের সচেতনতা, কার্যকর আইন প্রয়োগ, এবং উন্নত অবকাঠামো প্রয়োজন ।

  • লেখক : শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ।

বিকেপি/এনএ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইনি প্রশ্ন ও উত্তর আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর