যৌনকর্মীর মানহানির মামলা : পেশা নয়, মানুষই আইনের বিষয়
আইন ও আদালত ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১১
আমাদের সমাজে যৌনকর্মী শব্দটি উচ্চারিত হলেই এক ধরনের নৈতিক বিচার, ঘৃণা ও অবজ্ঞার আবরণ নেমে আসে। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন প্রায়ই চাপা পড়ে যায়- একজন যৌনকর্মী কি মানহানির মামলা করতে পারেন? আরো স্পষ্ট করে বললে, সমাজ যাকে 'অপরাধী' বা ‘নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য' বলে দাগিয়ে দেয়, আইন কি তাকেও সম্মান ও মর্যাদার সুরক্ষা দেয় না?
আইনের উত্তর স্পষ্ট: হ্যাঁ, যৌনকর্মীও মানহানির মামলা করতে পারেন। কারণ আইন পেশা দেখে নয়, মানুষ দেখে।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪৯৯ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির সম্মান বা সুনাম ক্ষুন্ন করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বক্তব্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা মানহানি। এখানে কোথাও বলা নেই যে নির্দিষ্ট কোনো পেশার মানুষ মানহানির সুরক্ষা পাবেন না। অর্থাৎ, যৌনকর্মীরাও এই আইনের বাইরে নন। যৌনকর্মী কি আইনত ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃত?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) এবং ৩১ অনুচ্ছেদ (আইনের সুরক্ষা) অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক আইনের সমান সুরক্ষা পাবে । যৌনকর্মী কোনো অপরাধী শ্রেণি নয়। বাংলাদেশে যৌনকর্মী হওয়া নিজে কোনো অপরাধ নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু কার্যকলাপ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। সুতরাং একজন যৌনকর্মীও একজন নাগরিক, যার সম্মান ও মর্যাদা আইনের দ্বারা সুরক্ষিত।
সমাজে একটি ভুল ধারণা আছে- যৌনকর্মীর আবার মান-সম্মান কী? আইন এই ধারণা স্বীকার করে না। যেসব ক্ষেত্রে যৌনকর্মীর মানহানি হতে পারে মিথ্যা অপরাধের অভিযোগ তাকে কারবারি, মানব পাচারকারী বা অপরাধী বলে মিথ্যা প্রচার করা। অযাচিত ও অপমানজনক প্রকাশনার ক্ষেত্রে নাম, ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মিথ্যা গুজবের ক্ষেত্রে বলা যায় তার পরিবার, সন্তান বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অপপ্রচার। পেশা ছাড়াও চরিত্রহনন অর্থাৎ যৌনকর্মী হওয়ার বাইরে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা নৈতিক অপবাদ আরোপ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল ও হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে ঘৃণা ছড়ানো, ব্যঙ্গচিত্র বা মানহানিকর মন্তব্য। আইনের দৃষ্টিতে, এসবই মানহানির উপাদান পূরণ করতে পারে।
‘সে তো যৌনকর্মী'-এই যুক্তি কি আইনে গ্রহণযোগ্য? একেবারেই নয়। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে- কোনো ব্যক্তির পেশা বা সামাজিক অবস্থান তার মানবিক মর্যাদা হ্রাস করে না। আইন বলে, কারো পেশা যদি সামাজিকভাবে বিতর্কিতও হয়, তবু তার সম্মান নষ্ট করার অধিকার কারো নেই। বরং যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রেই মানহানি অনেক সময় আরও মারাত্মক, কারণ তারা সমাজের প্রান্তিক ও দুর্বল শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
যৌনকর্মী কীভাবে মানহানির মামলা করতে পারেন যৌনকর্মী চাইলে ফৌজদারি মানহানি মামলা (দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা), দেওয়ানি ক্ষতিপূরণ মামলা দুই ধরনের প্রতিকারই চাইতে পারেন। এক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে লিখিত বা ভিডিও বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রিনশট সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা যায়। আইন থাকলেও বাস্তবে যৌনকর্মীরা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন।
থানায় অভিযোগ নিতে অনীহা, সামাজিক চাপ ও ভয়, আইনি সহায়তার অভাব, আদালতে মর্যাদাহানিকর আচরণ ফলে অধিকাংশ মানহানির ঘটনা বিচারালয়ে পৌঁছায় না। যৌনকর্মীর মানহানি প্রশ্নটি আসলে একটি বড় প্রশ্নের অংশ- আইন কি কেবল নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানুষদের জন্য, নাকি সকল মানুষের জন্য? যদি আমরা বিশ্বাস করি যে সংবিধান সবার জন্য, তবে যৌনকর্মীর সম্মানও সবার মতোই আইনের আওতাভুক্ত।
কাউকে অপছন্দ করা আর তার সম্মান করা এক বিষয় নয়-আইন এই পার্থক্য স্পষ্টভাবে টানে। যৌনকর্মীদের প্রতি ঘৃণা, অবজ্ঞা ও বিদ্বেষ যখন আইনের আড়ালে বৈধতা পেতে চায়, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই প্রবণতাকে থামানো। নচেৎ মানহানি আইন নিজেই মানহানিকর হয়ে উঠবে।
আইন কখনো পেশা দেখে না, দেখে মানুষ। এই সত্যটি যতদিন সমাজ মেনে না নেবে, ততদিন ন্যায়বিচার কেবল কাগজেই বন্দি থাকবে।
বিকেপি/এনএ

