নির্বাচনী হলফনামায় মিথ্যার রাজনীতি : প্রার্থী নয়, প্রশ্নবিদ্ধ গণতন্ত্র; আইন কি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ?
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০০
নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরীক্ষার নাম। অথচ সেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রই যদি ভুয়া তথ্য, গোপন সম্পদ ও মিথ্যা ঘোষণায় ভরা থাকে, তাহলে ফলাফল কতটা গ্রহণযোগ্য- সে প্রশ্ন আজ আর এড়ানোর সুযোগ নেই। নির্বাচনী হলফনামায় মিথ্যা বিবরণ দেওয়া বাংলাদেশে এখন ব্যতিক্রম নয়, বরং উদ্বেগজনকভাবে একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে- আইন কি সত্যিই অন্ধ, নাকি দেখেও না দেখার ভান করছে?
হলফনামা : সত্য বলার শপথ, নাকি প্রতারণার বৈধ কাগজ?
নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত হলফনামা কোনো সাধারণ ফরম নয়। এটি আদালতের শপথনামার মতোই আইনগতভাবে গুরুতর একটি দলিল। প্রার্থী এখানে রাষ্ট্র ও জনগণের কাছে অঙ্গীকার করেন যে, তিনি তার সম্পদ, আয়, মামলা-মোকদ্দমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশা সম্পর্কে সত্য তথ্য দিচ্ছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো এই হলফনামাই আজ সবচেয়ে বেশি মিথ্যার আশ্রয়স্থল। কোটি টাকার সম্পদ ‘শূন্য’, চলমান ফৌজদারি মামলা ‘নাই’, ঋণখেলাপি হয়েও ‘পরিষ্কার’- এমন অসংখ্য হলফনামা প্রতি নির্বাচনে জমা পড়ে। প্রশ্ন হলো, এগুলো কি অজান্তে ভুল, নাকি পরিকল্পিত প্রতারণা?
আইন পরিষ্কার, শাস্তি কঠোর- তবু কেন মিথ্যার সাহস?
আইনের দৃষ্টিতে নির্বাচনী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য প্রদান কোনো সামান্য অনিয়ম নয়; এটি সরাসরি অপরাধ। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (RPO) অনুযায়ী- মিথ্যা তথ্য প্রদান একটি Corrupt Practice।
- প্রার্থিতা বাতিলযোগ্য অপরাধ
- নির্বাচিত হলেও আসন বাতিল হতে পারে
- ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচনে অযোগ্যতা আরোপ হতে পারে
- এছাড়া দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ১৯৩ অনুযায়ী মিথ্যা হলফনামার শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড।
- ধারা ১৯৯ অনুযায়ী, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মিথ্যা ঘোষণা ফৌজদারি অপরাধ।
আইন যখন এত স্পষ্ট, তখন প্রশ্ন জাগে-প্রার্থীরা এত নির্ভয়ে মিথ্যা বলেন কীভাবে? উত্তর একটাই: শাস্তির বাস্তব প্রয়োগ নেই।
নির্বাচন কমিশন: ক্ষমতাবান না অসহায়?
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কমিশনের হাতে রয়েছে
- মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের পূর্ণ ক্ষমতা,
- মিথ্যা বা অসম্পূর্ণ হলে বাতিলের অধিকার,
- নির্বাচনের পর অভিযোগ তদন্তের সুযোগ,
কিন্তু বাস্তবে কমিশন প্রায়ই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে ‘নথিপত্রে যা আছে, তাই দেখব’ নীতিতে। সম্পদ, মামলা বা ঋণের তথ্য যাচাইয়ে সক্রিয় অনুসন্ধান খুব কমই দেখা যায়। ফলে মিথ্যা ধরা পড়ে মূলত নির্বাচনের পরে ততদিনে একজন মিথ্যাবাদী জনপ্রতিনিধি হয়ে যান।
দলীয় মনোনয়ন: এখানেই কি মিথ্যার মূল শিকড়?
নির্বাচনি দুর্নীতির শেকড় অনেক গভীরে—রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে-
- বিত্তশালী হওয়া যোগ্যতা,
- মামলা থাকলেও ‘ম্যানেজযোগ্য’ হওয়া শর্ত,
- জনসমর্থনের চেয়ে দলীয় প্রভাব মুখ্য
ফলে দল জানে- প্রার্থী হলফনামায় মিথ্যা বলেছেন, তবু তাকে মনোনয়ন দেয়। প্রশ্ন হলো, যে দল নিজের প্রার্থী বাছাইয়ে নৈতিকতা মানে না, তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় কী দেবে?
আদালতের অবস্থান : স্পষ্ট, কিন্তু বিচ্ছিন্ন
উচ্চ আদালত একাধিক রায়ে বলেছেন, ‘হলফনামায় মিথ্যা তথ্য প্রদান ভোটারের অধিকার হরণ এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা।’
কিছু ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের আসন বাতিলও হয়েছে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত এখনো ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় মিথ্যাবাদীরা সাহস পায়।
ভোটার ও গণমাধ্যম : দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
শুধু প্রার্থী বা কমিশন নয়-ভোটার ও গণমাধ্যমও দায় এড়াতে পারে না। অধিকাংশ ভোটার হলফনামা পড়েন না
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্বল : তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি ফলে মিথ্যা তথ্য জনপরিসরে চ্যালেঞ্জহীন থেকে যায়।
সংস্কার না হলে পরিণতি ভয়াবহ : যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে সংসদে অপরাধী ও মিথ্যাবাদীর সংখ্যা বাড়বে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ভেঙে পড়বে, নির্বাচন একটি আনুষ্ঠানিক নাটকে পরিণত হবে।
এটি কেবল একটি নির্বাচনের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি এখনই প্রয়োজন হলফনামায় মিথ্যা প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক প্রার্থিতা বাতিল।
নির্বাচনের আগেই তথ্য যাচাইয়ে আন্তঃসংস্থা সমন্বয় রাজনৈতিক দলের জন্য বাধ্যতামূলক।
নৈতিক মনোনয়ন বিধিমালা, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল :
নির্বাচনী হলফনামায় মিথ্যা বলা মানে জনগণের রায়কে আগেই বিকৃত করা। এটি কোনো ‘কৌশল’ নয়, এটি অপরাধ। আইন আছে, আদালত আছে, নির্বাচন কমিশন আছে—তবু যদি মিথ্যা জয়ী হয়, তবে ব্যর্থতা ব্যক্তির নয়, পুরো ব্যবস্থার। এখনই যদি কঠোরভাবে এই মিথ্যার রাজনীতির লাগাম টানা না হয়, তবে একদিন ভোট থাকবে, নির্বাচন থাকবে- কিন্তু গণতন্ত্র থাকবে না।
বিকেপি/এনএ

