Logo

আইন ও বিচার

১০৭ ধারায় শান্তির নাম করে সন্দেহভাজন শাস্তি; আইন নাকি ক্ষমতার হাতিয়ার?

Icon

রাকিব খাঁন

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২১

১০৭ ধারায় শান্তির নাম করে সন্দেহভাজন শাস্তি; আইন নাকি ক্ষমতার হাতিয়ার?

দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় এমন কিছু ধারা আছে, যেগুলো কাগজে-কলমে জনশান্তি রক্ষার জন্য তৈরি হলেও বাস্তবে সেগুলো পরিণত হয়েছে হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব করার অস্ত্রে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭ ধারা ঠিক তেমনই একটি বিধান। প্রশ্ন উঠছে- এই ধারা কি সত্যিই শান্তি রক্ষার আইন, নাকি সন্দেহের ভিত্তিতে শাস্তি দেওয়ার বৈধ ছাড়পত্র?

১০৭ ধারা আসলে কী বলে :

CrPC-এর ১০৭ ধারার মূল উদ্দেশ্য হলো- শান্তিভঙ্গ প্রতিরোধ। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো ব্যক্তি শান্তিভঙ্গ করতে পারে বা জনশান্তির জন্য হুমকি হতে পারে, তবে তিনি ওই ব্যক্তিকে কারণ দর্শাতে নির্দেশ দিতে পারেন কেন তাকে শান্তি রক্ষার জন্য মুচলেকা দিতে বাধ্য করা হবে না।

এখানে লক্ষণীয় শব্দটি হলো- ‘প্রতীয়মান হয়’। কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়া নয়, এমনকি অপরাধের চেষ্টাও নয়, শুধু সম্ভাবনা। এই ‘সম্ভাবনা’ নির্ধারণ করবেন কে? পুলিশি প্রতিবেদন ও ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির ওপরই পুরো প্রক্রিয়া দাঁড়িয়ে আছে।

অপরাধ ছাড়াই আইনি শৃঙ্খল- এটাই কি ন্যায়বিচার?

১০৭ ধারার সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো- এটি প্রিভেন্টিভ জাস্টিস বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। অর্থাৎ, ব্যক্তি এখনো কোনো অপরাধ করেননি, তবু তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় জড়ানো হচ্ছে।

আইনের শাসনের মৌলিক নীতি হলো- অপরাধ না করলে শাস্তি নয়। কিন্তু ১০৭ ধারা সেই নীতিকে উল্টোভাবে দাঁড় করায়। এখানে অপরাধের প্রমাণ নয়, সন্দেহই যথেষ্ট।

প্রশ্ন হলো, শুধু আশঙ্কার ভিত্তিতে একজন নাগরিককে আদালতে হাজির করা, মুচলেকা দিতে বাধ্য করা বা ব্যর্থ হলে কারাগারে পাঠানো কি সংবিধানসম্মত?

১০৭ থেকে ১১৬: একটি ধারার ভেতর বন্দিত্ব

১০৭ ধারার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়-

  • ধারা ১১২: কারণ দর্শানোর নোটিশ,
  • ধারা ১১৬: তদন্তকালীন আটক রাখার ক্ষমতা,

এই ১১৬ ধারাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এতে বলা হয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হেফাজতে নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ, কোনো অপরাধ ছাড়াই একজন ব্যক্তি কার্যত বন্দি হয়ে যেতে পারেন- শুধু পুলিশের রিপোর্টের ভিত্তিতে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক অপব্যবহার:

বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়,

  • রাজনৈতিক কর্মসূচির আগে বিরোধী দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে ১০৭ ধারা,
  • জমি বা পারিবারিক বিরোধে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে ১০৭,
  • স্থানীয় প্রভাবশালীদের স্বার্থে পুলিশি রিপোর্টের মাধ্যমে হয়রানি।

এখানে আইনটি শান্তি রক্ষার বদলে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

পুলিশি প্রতিবেদনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা :

১০৭ ধারার প্রয়োগে পুলিশের রিপোর্টই মূল ভিত্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো-

  • রিপোর্ট কতটা নিরপেক্ষ?
  • রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ কতটা কাজ করে?
  • অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শুনে নেওয়া হয় কি আদৌ?

পুলিশ যদি ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য দেয়, তার দায় কে নেবে? বাস্তবে দেখা যায়, এই দায় প্রায় কখনোই নির্ধারিত হয় না। আইনে ম্যাজিস্ট্রেটকে স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে ধরা হলেও বাস্তবে অভিযোগ আছে- অনেক ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটরা পুলিশের প্রতিবেদনের ওপর যান্ত্রিকভাবে নির্ভর করেন।

১০৭ ধারার মূল চেতনা ছিল- ম্যাজিস্ট্রেট নিজে সন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু যদি সেই সন্তুষ্টি যাচাই ছাড়াই আসে, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি একটি রুটিন ফাইল চালানিতে পরিণত হয়।

  • বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১: আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার,
  • অনুচ্ছেদ ৩৩: গ্রেপ্তার ও আটক বিষয়ে সুরক্ষা,

১০৭ ধারার অপব্যবহার এসব মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কারণ এখানে গ্রেপ্তার হচ্ছে অপরাধের জন্য নয়, আশঙ্কার জন্য।

আদালতের পর্যবেক্ষণ: সতর্কবার্তা উপেক্ষিত

উচ্চ আদালত একাধিক মামলায় বলেছেন, ‘১০৭ ধারা যেন শাস্তিমূলক নয়, প্রতিরোধমূলক চরিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে।’

কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই সতর্কতা কতটা মানা হচ্ছে-সে প্রশ্ন আজও অনুত্তরিত। ১০৭ ধারার প্রধান ত্রুটিগুলো হলো-

  • ‘শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা’র অস্পষ্ট সংজ্ঞা,
  • পুলিশের প্রতিবেদনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা,
  • তদন্তকালীন আটক রাখার অপব্যবহার,
  • ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য কার্যকর প্রতিকার না থাকা।

সংস্কার ছাড়া মুক্তি নেই, এই ধারার অপব্যবহার রোধে জরুরি-

  • ‘শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা’র স্পষ্ট আইনগত সংজ্ঞা,
  • পুলিশি প্রতিবেদনের স্বাধীন যাচাই,
  • ১১৬ ধারায় আটককে ব্যতিক্রম হিসেবে সীমাবদ্ধ করা,
  • অপব্যবহারে জড়িত কর্মকর্তার জবাবদিহি।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭ ধারা যদি সত্যিই শান্তি রক্ষার জন্য হয়, তবে সেটি শান্তির মতোই স্বচ্ছ ও ন্যায্য হতে হবে। সন্দেহের ভিত্তিতে নাগরিককে হয়রানি করা হলে তা শান্তি নয়, নীরব ভয় সৃষ্টি করে। আইন যদি জনগণকে রক্ষা না করে, বরং ভীত করে-তবে সেই আইন সংস্কারের দাবি তোলে। প্রশ্ন তাই স্পষ্ট- ১০৭ ধারা থাকবে কি থাকবে না, তা নয়; প্রশ্ন হলো এটি আইন হিসেবে চলবে, নাকি ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে থাকবে?

বিকেপি/এনএ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর