Logo

আইন ও বিচার

কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই শ্রমিক টারমিনেশন: আইন কি উপেক্ষিত?

Icon

অ্যাড. কেএম খাইরুল কবীর

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩১

কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই শ্রমিক টারমিনেশন: আইন কি উপেক্ষিত?

শ্রমিকের চাকরি শুধু একটি আয়ের উৎস নয়- এটি তার জীবিকা, মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অথচ বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বহু শিল্প ও প্রতিষ্ঠানে আজও কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই শ্রমিককে হঠাৎ টারমিনেট করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এই প্রবণতা শ্রম আইনের সুস্পষ্ট বিধান, ন্যায়বিচারের নীতি এবং মানবিক মূল্যবোধ সবকিছুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮ ও ২০২৩) শ্রমিকের চাকরিচ্যুতি, বরখাস্ত ও অবসান বিষয়ে বিস্তারিত ও বাধ্যতামূলক বিধান প্রদান করেছে। এই আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো শ্রমিককে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আগে ন্যায়সঙ্গত শুনানির সুযোগ দিতে হবে। কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) সেই ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ।

আইন কী বলে?

বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো শ্রমিকের বিরুদ্ধে অসদাচরণ (misconduct) অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে হলে প্রথমে লিখিত অভিযোগ জানাতে হবে এবং তাকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে। এরপর তদন্ত কমিটি গঠন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং লিখিত সিদ্ধান্ত- এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে শাস্তিমূলক টারমিনেশন আইনত অবৈধ বলে গণ্য হয়।

শ্রম আইন এর ২৩ ধারা অনুযায়ী, শাস্তিমূলক বরখাস্তের ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত ও কারণ দর্শানোর নোটিশ অপরিহার্য। এই বিধান লঙ্ঘন করে যদি কোনো শ্রমিককে টারমিনেট করা হয়, তাহলে তা ‘unlawful termination’ হিসেবে গণ্য হবে।

অন্যদিকে, ব্যবস্থাপনাগত কারণে (unlawful termination) চাকরি অবসান করলেও আইনের নির্ধারিত নোটিশ বা নোটিশের পরিবর্তে মজুরি প্রদান বাধ্যতামূলক। এখানেও হঠাৎ, বিনা নোটিশে টারমিনেশন আইনসম্মত নয়।

কারণ দর্শানো ছাড়া টারমিনেশন কেন অবৈধ? : কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়া শ্রমিককে টারমিনেট করা হলে-

  • শ্রমিকের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়,
  • প্রাকৃতিক বিচারনীতির (Principles of Natural Justice) লঙ্ঘন ঘটে,
  • শ্রমিকের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা ধ্বংস হয়,
  • শিল্পে অস্থিরতা ও শ্রম অসন্তোষ তৈরি হয়।

এ ধরনের টারমিনেশন আদালতের দৃষ্টিতে সাধারণত দুরভিসন্ধিমূলক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ বলে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশের শ্রম আদালত ও উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আইনবিরুদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রে আদালত টারমিনেশন বাতিল করে শ্রমিককে পুনর্বহাল (reinstatement) অথবা ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতের মতে, ‘শ্রমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অথবা ন্যায়সঙ্গত শুনানি না হলে চাকরিচ্যুতি টেকসই হতে পারে না।’

মালিক পক্ষের দায়িত্ব :

  • শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের মালিক পক্ষের উচিত- 
  • শ্রম আইন সম্পর্কে সচেতন থাকা,
  • শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা,
  • শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা,
  • আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি এড়ানো,

আইন না মেনে টারমিনেশন শেষ পর্যন্ত মালিক পক্ষের জন্য আর্থিক ক্ষতি, মামলা ও সুনামহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শ্রমিকের করণীয় :

  • কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়া টারমিনেশন হলে শ্রমিক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে আপত্তি জানাতে পারেন,
  • কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে পারেন,
  • নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন।

আইন শ্রমিকের পাশে আছে, শর্ত হলো সচেতনতা ও সময়মতো পদক্ষেপ।

কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়া শ্রমিককে টারমিনেট করা কেবল একটি প্রশাসনিক অনিয়ম নয়- এটি আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা। টেকসই শিল্পায়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে শ্রম আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। শ্রমিক ও মালিক উভয়ের অধিকার রক্ষায় আইনের শাসনই হতে পারে একমাত্র পথ।

বিকেপি/এনএ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর