Logo

আইন ও বিচার

মশা নিধনে ব্যর্থতা : ডেঙ্গুর ভোগান্তি ও নাগরিকের আইনগত অধিকার

Icon

সোহানা ইয়াসমিন, মানবাধিকার কর্মী

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৫

মশা নিধনে ব্যর্থতা : ডেঙ্গুর ভোগান্তি ও নাগরিকের আইনগত অধিকার

রাজধানী ঢাকা আজ কার্যত এক অনিরাপদ নগরীতে পরিণত হয়েছে। উন্নয়নের জোয়ার, উড়ালসড়ক ও মেগা প্রকল্পের শহরে নাগরিকের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার- স্বাস্থ্য ও নিরাপদ পরিবেশ আজ চরম হুমকির মুখে। দুই সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকাজুড়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অথচ মশা নিধনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ফলাফল- হাসপাতালে উপচে পড়া রোগী, মৃত্যুর শঙ্কা আর সাধারণ মানুষের সীমাহীন ভোগান্তি।

ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালীন রোগ নয়; এটি প্রশাসনিক অবহেলা ও নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার একটি স্থায়ী চিহ্ন। প্রতিবছর একই চিত্র- বৃষ্টির শুরু, কিছু প্রচারণা, কয়েকদিন ফগিং, এরপর সব থেমে যায়। মশার বংশবিস্তার থামে না, থামে না রোগীর সংখ্যা।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন- দুই সংস্থাই মশা নিধনের দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে কার্যকর কোনো সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা দেখা যায় না। কোথাও কীটনাশক নেই, কোথাও লোকবল নেই, আবার কোথাও অভিযোগ- ওষুধ কার্যকর নয়। কিন্তু এসব অজুহাতের খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়া মানেই শুধু শারীরিক কষ্ট নয়; এটি একটি পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়ও বটে। সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকট, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কর্মক্ষম মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরিবারে আয়ের সংকট তৈরি হচ্ছে।

আইনের চোখে সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা সিটি কর্পোরেশনের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।

 ঢাকা সিটি কর্পোরেশন আইন, ২০০৯ অনুযায়ী- জনস্বাস্থ্য রক্ষা, রোগ প্রতিরোধ, মশা ও ক্ষতিকর পোকামাকড় নিধন করা  সিটি কর্পোরেশনের আইনগত কর্তব্য।

স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন স্পষ্টভাবে বলে-  জনস্বাস্থ্য অবহেলাজনিত ক্ষতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না। অর্থাৎ, মশা নিধনে ব্যর্থতা কোনো নীতিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি আইনগত অবহেলা। 

ভুক্তভোগী নাগরিকদের আইনগত অধিকার কী? 

ডেঙ্গু আক্রান্ত নাগরিকরা আইনের চোখে নিছক রোগী নন; তারা রাষ্ট্রের ব্যর্থতার শিকার। ফলে তাদের কিছু সুস্পষ্ট আইনগত অধিকার রয়েছে- 

বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫: মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা, অনুচ্ছেদ ১৮(১): জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরাসরি এই সাংবিধানিক দায় লঙ্ঘনের শামিল।

আইনগত প্রতিকার ও মামলা ভুক্তভোগীরা দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারেন। প্রশাসনিক অবহেলার জন্য রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন। ইতিপূর্বে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য অবহেলার মামলায় উচ্চ আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছেন- এ নজির উপেক্ষার সুযোগ নেই।

সিটি কর্পোরেশন নাগরিকের কাছ থেকে কর ও ফি আদায় করে। সেই সেবার বিনিময়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হলে তা কার্যত সেবার ঘাটতি (উবভরপরবহপু ড়ভ ঝবৎারপব) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

জবাবদিহির অভাব: মূল সংকট এখানেই 

ঢাকার ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জবাবদিহির অভাব। রোগী বাড়ে, মানুষ মারা যায়- কিন্তু দায় নেয়ার কেউ নেই। প্রতিবছর একই আশ্বাস, একই পরিকল্পনা, কিন্তু কোনো ব্যর্থতার হিসাব নেই। যদি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অবহেলার কারণে মানুষের ক্ষতি করত, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হতো। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন হলে যেন সব দায় ধোঁয়াশায় মিলিয়ে যায়। এই দ্বৈত মানসিকতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য নয়।

শুধু ফগিং নয়, দরকার সমন্বিত আইনগত ব্যবস্থা : মশা নিধন মানে কেবল ফগিং মেশিন চালানো নয়। এটি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও আইননির্ভর প্রক্রিয়া। দরকার  এলাকাভিত্তিক লার্ভা শনাক্তকরণ, নির্মাণাধীন ভবনে আইনগত তদারকি, জলাবদ্ধতা নিরসনে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা, অবহেলাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা ও মামলা। কিন্তু এসব উদ্যোগের কার্যকর প্রয়োগ না থাকলে আইন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।

ঢাকার ডেঙ্গু সংকট প্রকৃতপক্ষে একটি স্বাস্থ্যগত দুর্যোগের পাশাপাশি আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দলিল। নাগরিকরা কর দেবেন, ভোট দেবেন, কিন্তু বিনিময়ে যদি নিরাপদ জীবনই না পান- তবে সেই নগর রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?

সিটি কর্পোরেশনগুলোকে এখনই বুঝতে হবে—মশা নিধন কোনো ঐচ্ছিক কর্মসূচি নয়; এটি একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা। আর নাগরিকদেরও জানতে হবে- ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার নয়, বরং অবহেলার ফল, যার জন্য দায়ীকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।

আইন আছে, অধিকার আছে- এখন প্রয়োজন সচেতনতা ও সম্মিলিত দাবি। নইলে প্রতিবছর ডেঙ্গু আসবে, মানুষ ভুগবে, আর দায় এড়িয়ে যাবে দায়িত্বশীলরা। এই চক্র ভাঙতেই হবে- জনস্বার্থেই, আইনের শাসনের স্বার্থেই।

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর