রাষ্ট্রীয় সীমানা, আইন ও অপরাধ সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোরতার সময়
আইন ও আদালত ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১১
রাষ্ট্রীয় সীমানা কোনো ভৌগোলিক রেখা মাত্র নয়; এটি একটি দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রিক মর্যাদার প্রতীক। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্থল, নৌ ও আকাশসীমা রক্ষার দায়িত্ব কেবল সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নয়, বরং আইন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক ব্যবস্থার ওপর ন্যস্ত। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্রীয় সীমানা ঘিরে অপরাধ, চোরাচালান, মানবপাচার, মাদক ব্যবসা ও অনুপ্রবেশ আজও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে।
সীমানা আইন: কাগজে শক্ত, প্রয়োগে দুর্বল।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সীমানা সংক্রান্ত আইন ও বিধান একেবারে অনুপস্থিত নয়। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড আইন, ২০১০, পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩, ইমিগ্রেশন আইন, ১৯২২, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ এবং মানবপাচার দমন ও প্রতিরোধ আইন, ২০১২- এসব আইনের মাধ্যমে সীমান্ত অপরাধ দমনের আইনগত কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে দেখা যায়, আইনের কঠোরতা যতটা প্রয়োজন, তার চেয়ে ঢিলেমিই বেশি কার্যকর। সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি অপরাধী চক্র সক্রিয়, যারা স্থানীয় প্রভাবশালী, অসাধু ব্যবসায়ী ও সীমান্তের দুই পাশের দালালদের নিয়ে গড়ে তুলেছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। আইনের ফাঁকফোকর, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা নির্বিঘেœ অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় সীমানা অপরাধের সবচেয়ে প্রচলিত রূপ হলো চোরাচালান। খাদ্যশস্য, সার, চিনি, পেঁয়াজ, গবাদিপশু থেকে শুরু করে স্বর্ণ, অস্ত্র ও মাদক—সবকিছুই সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে যাতায়াত করছে। এর ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্র বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্প ও কৃষি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
বিশেষ করে সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তরুণ সমাজ ধ্বংসের পথে যাচ্ছে, অথচ মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সীমান্ত অপরাধ এখানে আর কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি এখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
রাষ্ট্রীয় সীমানা অপরাধের ভয়াবহ রূপ মানবপাচার। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও স্বপ্ন বিক্রির ফাঁদে পড়ে প্রতিবছর হাজারো মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে বিদেশে যাচ্ছে। অনেকেই নিখোঁজ হচ্ছে, কেউ কেউ দাসশ্রমে নিপতিত হচ্ছে, কেউ আবার লাশ হয়ে ফিরছে- যদি ফিরতে পারে।
আইনে মানবপাচারের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকলেও মামলার দীর্ঘসূত্রিতা, সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতা ও সীমান্ত এলাকার ভৌগোলিক জটিলতা অপরাধীদের রক্ষা করছে। প্রশ্ন থেকে যায়- আইন কি কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি থাকবে, নাকি বাস্তবে মানবিক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ভূমিকা নেবে?
রাষ্ট্রীয় সীমানা লঙ্ঘনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অবৈধ অনুপ্রবেশ। এটি কেবল অভিবাসন সমস্যা নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকি, সামাজিক ভারসাম্যহীনতা ও আইনগত জটিলতা। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পরিচয়হীনতা অপরাধ তদন্তে বড় বাধা সৃষ্টি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন অপরাধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে দ্বিমুখী—একদিকে মানবিকতা, অন্যদিকে সার্বভৌমত্ব। কিন্তু এই ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন শক্ত আইন, সুস্পষ্ট নীতি ও কঠোর প্রয়োগ।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ঘাটতি:
আজকের বিশ্বে সীমান্ত নিরাপত্তা আর কেবল অস্ত্রধারী প্রহরীর ওপর নির্ভরশীল নয়। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো ড্রোন, স্মার্ট ফেন্সিং, বায়োমেট্রিক নজরদারি ও ডিজিটাল ডাটাবেস ব্যবহার করে সীমান্ত অপরাধ দমন করছে। বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এখনো সীমিত।
ফলে দীর্ঘ ও দুর্গম সীমান্ত এলাকায় নজরদারি অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। এই শূন্যস্থানই অপরাধীদের জন্য নিরাপদ করিডোর তৈরি করছে।
সীমান্ত অপরাধ দমনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জবাবদিহির অভাব। কোথাও অপরাধ ঘটে গেলে দায় পড়ে নিচের সারির কর্মকর্তা বা সাধারণ মানুষের ওপর, কিন্তু পরিকল্পনাকারী ও মদদদাতারা থেকে যায় অদৃশ্য। সীমান্ত এলাকায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা অনেক সময় ধামাচাপা পড়ে যায়।
একটি কার্যকর সীমান্ত আইন ব্যবস্থা গড়তে হলে বাহিনীর সক্ষমতার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নইলে আইন নিজেই অপরাধ দমনের বদলে অপরাধের সহায়ক হয়ে দাঁড়াবে।
রাষ্ট্রীয় সীমানা আইন ও অপরাধ কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি সরাসরি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। আইন আছে, বাহিনী আছে, কিন্তু প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা।
সীমান্ত অপরাধ দমনে এখনই প্রয়োজন-
সীমান্ত আইনসমূহের যুগোপযোগী সংশোধন, বিশেষ সীমান্ত ট্রাইব্যুনাল গঠন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, সীমান্তবাসীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, রাষ্ট্র যদি নিজ সীমানা রক্ষায় দৃঢ় না হয়, তবে সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানের পাতায় বন্দি শব্দে পরিণত হবে। সময় এসেছে আইনকে কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তব প্রয়োগে শক্তিশালী করার। রাষ্ট্রীয় সীমানা রক্ষা মানেই রাষ্ট্রকে রক্ষা করা- এই সত্য অস্বীকারের সুযোগ নেই।
বিকেপি/এমবি

