Logo

আইন ও বিচার

টার্গেট কিলিং, ঝুঁকিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৫

টার্গেট কিলিং, ঝুঁকিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা

গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ততই বাড়ছে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা ও হত্যাকাণ্ড- যা সাধারণ মানুষের কাছে “টার্গেট কিলিং” নামে পরিচিত। রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও বিশেষ দলের নেতা-কর্মীদের ওপর সাম্প্রতিক ধারাবাহিক হামলা দেশের আইনশৃঙ্খলার সামগ্রিক অবনতিকে সামনে এনে দিয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত ভয় ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ছে; আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, এই পরিস্থিতি নির্বাচনকে ঘিরে আরও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

হঠাৎ উত্থান টার্গেট কিলিংয়ের
নির্বাচনী পরিবেশে রাজনৈতিক সংঘর্ষ নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আলাদা মাত্রা পেয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় রাতে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া, মোটরসাইকেলে মুখোশধারীর হামলা, কিংবা নির্জন স্থানে গুলি করে হত্যা- এসব ঘটনায় একটি সংগঠিত গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার ধারণা জোরালো হচ্ছে।  বিএনপির দাবি, তাদের নেতা-কর্মীদের আতঙ্কগ্রস্ত করতে পরিকল্পিতভাবে ‘টার্গেট কিলিং’ চালানো হচ্ছে। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকায় প্রশ্ন
নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার কর্মী এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকায় স্পষ্ট দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। 

একাধিক ঘটনা ঘটলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দ্রুত তদন্ত, গ্রেপ্তার বা আইনি পদক্ষেপের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট তৎপর নন, যদিও তারা সরকারি বক্তব্যে পরিস্থিতিকে “স্বাভাবিক” বলে দাবি করে আসছেন। তবে এসব অভিযোগের কোনো দিকই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি- আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সব ধরনের অপরাধই তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করা, ভয় সৃষ্টি করা বা মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। তবে এ ধরনের সহিংসতার আধুনিক রূপ আরও পরিশীলিত-পরিকল্পিত, সংগঠিত এবং আইনশৃঙ্খলাকে চ্যালেঞ্জ করে এমন। টার্গেট কিলিংয়ের উদ্দেশ্য শুধু শারীরিক ক্ষতি করা নয়; বরং প্রতিপক্ষ শিবিরে মানসিক আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে রাজনৈতিক কর্মীরা মাঠে নামতে সাহস না পান। সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নিহতদের রাজনৈতিক ভূমিকা, সক্রিয়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। এতে ধারণা জন্মেছে যে হামলা শুধুই ব্যক্তিগত বিরোধ বা অপরাধীচক্রের কাজ নয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ও সহকর্মীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

রাজনৈতিক সহিংসতার বাড়াবাড়ি সাধারণ জনগণের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। শহর-গ্রাম উভয় জায়গায় সন্ধ্যার পর মানুষের চলাফেরা কমে গেছে। ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরা জানাচ্ছেন, পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আইনশৃঙ্খলা অবনতির ফলে ব্যবসায়িক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন; সেই দৃষ্টিতে বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

টার্গেট কিলিংয়ের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছেন মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তাদের ভাষ্যে, তদন্ত ব্যবস্থার ধীরগতি এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে অপারগতা আইনবহির্ভূত শক্তিগুলোকে উৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রেই সাক্ষীরা মুখ খুলতে ভয় পান- এমনকি পরিবারগুলোও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে কি না তা নিয়ে সন্দিহান।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যে কোনো হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলে তার প্রভাব বহুমাত্রিক। অপরাধ দমন করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি হয়। তাই সব পক্ষের ওপর সরকারি ও বিচারিক নজরদারি বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উত্তাপ স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে, কিন্তু তা যদি সহিংসতার দিকে চলে যায়, তাহলে নির্বাচন আয়োজন নিজেই কঠিন হয়ে উঠবে। দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ধরে রাখতে হলে সহিংসতা বন্ধ করা, অপরাধীদের চিহ্নিত করা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের আগে তিনটি পদক্ষেপ জরুরি- দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন- প্রতিটি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় আলাদা তদন্ত টিম থাকা উচিত, যাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি : মাঠপর্যায়ে তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও নিয়মিত ব্রিফিং ও তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ : প্রতিটি দলকে সমান নিরাপত্তা দেওয়া এবং রাজনৈতিক পরিবেশকে শান্ত রাখা নির্বাচন আয়োজনের মূল শর্ত।

টার্গেট কিলিং আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি রাজনৈতিক সহিংসতার এক ভয়ানক রূপ, যা দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং মানুষের ন্যূনতম নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা, তদন্তের ধীরগতি এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

নির্বাচনের আগে এই সহিংসতার ঢেউ থামানো না গেলে শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই নয়, দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশও গভীর সংকটে পড়তে পারে। দায়িত্বশীল মহলের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন নতুবা সহিংসতার এই পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, যার মূল্য দিতে হবে পুরো দেশকে।

বিকেপি/এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর