Logo

আইন ও বিচার

জাতীয় নির্বাচনে পুলিশের বডি ক্যামেরা কেনায় প্রশ্ন

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন কী বলে ?

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৮

জাতীয় নির্বাচনে পুলিশের বডি ক্যামেরা কেনায় প্রশ্ন

দেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও পুলিশের পেশাগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বডি ক্যামেরা একটি যুগোপযোগী প্রযুক্তি- এ নিয়ে দ্বিমত নেই। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, পুলিশের আচরণ মনিটরিং এবং বিতর্কিত পরিস্থিতিতে সত্য উদঘাটনের জন্য এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়বহুল উদ্যোগ যখন তড়িঘড়ি বাস্তবায়নের নামে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে, তখন সেটি আর কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা থাকে না- তা রূপ নেয় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে।

সম্প্রতি পুলিশের বডি ক্যামেরা কেনা ও ব্যাটারি সরবরাহ নিয়ে যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, যেসব বডি ক্যামেরার ব্যাটারি সর্বনিম্ন ৮ ঘণ্টা চার্জ থাকার কথা, সেগুলো বাস্তবে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সচল থাকছে। অথচ এই প্রকল্পের আওতায় দেড় লাখের বেশি পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে ১০ হাজার ব্যাটারি পুলিশ টেলিকম কর্তৃপক্ষের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, নিম্নমানের ব্যাটারি কীভাবে সরকারি ক্রয়ে অনুমোদন পেল? টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন যাচাই হয়েছে কি না? দায় কার- সরবরাহকারীর, নাকি ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষের? এটি কি নিছক অব্যবস্থাপনা, নাকি অর্থ অপচয় ও দুর্নীতির ইঙ্গিত?

নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা জোরদারের যুক্তি দেখিয়ে কয়েকশ’ কোটি টাকার বডি ক্যামেরা কেনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- নিরাপত্তা কি কেবল যন্ত্র কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? যদি সেই যন্ত্রই নির্ভরযোগ্য না হয়, তবে তা ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তার বদলে বিভ্রান্তিই বাড়াবে।

একজন পুলিশ সদস্য ৮ ঘণ্টার ডিউটিতে থাকলে যদি ক্যামেরার চার্জ ৪ ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়, তবে সেই ক্যামেরা কার স্বার্থে, কোন কাজে ব্যবহৃত হবে?

এই ব্যর্থতা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটি নীতিগত ব্যর্থতা।

সরকারি ক্রয় আইন কী বলে? 
বাংলাদেশে সরকারি ক্রয় পরিচালিত হয়- পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬ (PPA), পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস, ২০০৮ (PPR) - এই আইন ও বিধিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা বজায় রাখা, রাষ্ট্রের অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা।

আইনগতভাবে যেসব ধারা প্রযোজ্য
দরপত্রে যদি ব্যাটারির চার্জ সক্ষমতা ৮ ঘণ্টা নির্ধারিত থাকে, অথচ সরবরাহকৃত ব্যাটারি সেই মান পূরণ না করে, তাহলে তা সরাসরি টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন লঙ্ঘন। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস অনুযায়ী এমন পণ্য গ্রহণযোগ্য নয়।

স্পেসিফিকেশন লঙ্ঘন (PPR Rule 29 I 31) : দরপত্রে যদি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে যে ব্যাটারি কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা চলবে, অথচ বাস্তবে তা ৪-৫ ঘণ্টা চলে, তাহলে এটি সরাসরি টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন ভঙ্গ।

একে আইনের ভাষায় বলা হয় ‘Material Deviation’- যা গ্রহণযোগ্য নয়।

নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ (Substandard Supply) : সরবরাহকৃত পণ্য যদি চুক্তি অনুযায়ী মান বজায় না রাখে, তাহলে-

চুক্তি বাতিলযোগ্য, অর্থ ফেরত দাবি করা যায়, সরবরাহকারীকে কালো তালিকাভুক্ত করা যায় (Rule 127)।

দায়িত্বে অবহেলা (Negligence of Procuring Entity) : সরবরাহ গ্রহণের আগে Inspection & Acceptance Committee পণ্য যাচাই করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রশ্ন হলো সেই কমিটি কি কার্যকরভাবে কাজ করেছে? নাকি কাগজে-কলমে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে?

যদি যাচাই না করেই বিল পরিশোধ করা হয়ে থাকে, তাহলে তা সরকারি কর্মচারীর গুরুতর গাফিলতি, এমনকি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এই ঘটনায় একক কোনো পক্ষকে দায়ী করে দায় সারা যাবে না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী মান বজায় না রাখলে এটি চুক্তি ভঙ্গ। প্রতারণার প্রমাণ মিললে ফৌজদারি মামলার সুযোগ রয়েছে (দণ্ডবিধি ৪২০ ধারা)।

প্রকিউরমেন্ট কর্তৃপক্ষ দরপত্র মূল্যায়নে গাফিলতি, টেকনিক্যাল টেস্ট না করে গ্রহণ, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের কাছে নতি স্বীকার- সবই তদন্তসাপেক্ষ।

সরকারি ক্রয়ে CPTU, অডিট অধিদপ্তর ও দুদকের নজরদারি থাকার কথা। তাহলে এত বড় প্রকল্পে এই ব্যর্থতা কীভাবে চোখ এড়াল?

আইনগত প্রতিকার কী?
এই মুহূর্তে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সামনে কয়েকটি স্পষ্ট আইনগত পথ খোলা রয়েছে, স্বাধীন টেকনিক্যাল অডিট, তৃতীয় পক্ষ দিয়ে ব্যাটারির সক্ষমতা পরীক্ষা করা। চুক্তি স্থগিত বা বাতিল- মান পূরণ না হলে সরবরাহ বাতিল ও নতুন দরপত্র, অর্থ ফেরত ও ক্ষতিপূরণ- সরকারি কোষাগারের ক্ষতি পূরণ।

এছাড়া অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া, ব্যয় ও মানহীন সরবরাহ সবকিছুই দুদকের এখতিয়ারভুক্ত।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থা : দায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, স্বচ্ছতা না থাকলে প্রযুক্তিও ব্যর্থ, বডি ক্যামেরা আনার মূল উদ্দেশ্য ছিল পুলিশের কাজে স্বচ্ছতা আনা। কিন্তু যদি সেই ক্যামেরা কেনার প্রক্রিয়াই অস্বচ্ছ হয়, তবে তা জাতির জন্য আত্মঘাতী।

জনগণের করের টাকায় কেনা একটি যন্ত্র যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তবে সেটি শুধু অর্থের অপচয় নয়- এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার ক্ষয়।

নির্বাচন আসে-যায়। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও বিশ্বাসযোগ্যতা স্থায়ী হওয়া উচিত। পুলিশের বডি ক্যামেরা কেনা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা এখনই স্পষ্ট ও সাহসীভাবে মোকাবিলা না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্নীতির পথ প্রশস্ত হবে। সরকারি ক্রয় মানে শুধু কেনাকাটা নয়- এটি জনস্বার্থের সঙ্গে চুক্তি। সেই চুক্তি ভঙ্গ হলে জবাবদিহি চাইতেই হবে।

সরকারি ক্রয় মানে কেবল পণ্য কেনা নয়; এটি জনগণের করের টাকার প্রতি দায়িত্ব। পুলিশের বডি ক্যামেরা কেনা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্ত এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। 

বিকেপি/এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

বাংলাদেশ পুলিশ আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর