Logo

আইন ও বিচার

জনপ্রতিনিধি কি বিচারক? আইন না জেনে ক্ষমতা প্রয়োগ বিপজ্জনক

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৬

জনপ্রতিনিধি কি বিচারক? আইন না জেনে ক্ষমতা প্রয়োগ বিপজ্জনক

গ্রাম বা মহল্লায় কোনো বিরোধ হলেই এখনো শোনা যায়- "চেয়ারম্যানের কাছে বিচার হয়েছে", "ওয়ার্ড মেম্বার শাস্তি দিয়েছেন"। কোথাও জরিমানা, কোথাও মুচলেকা, কোথাও সামাজিক দণ্ড। কিন্তু দেশের বর্তমান আইনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কিংবা সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কি আদৌ দেওয়ানি বা ফৌজদারি অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা আছে? সরল উত্তর না, নেই। অথচ বাস্তবে যা ঘটছে, তা আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক।

সংবিধান স্পষ্ট করে বলেছে- বিচারিক ক্ষমতা নির্বাহী বা জনপ্রতিনিধির হাতে নয়; তা ন্যস্ত থাকবে আইনে প্রতিষ্ঠিত আদালতের ওপর। সংবিধানের ৯৪ থেকে ১১৬ক অনুচ্ছেদ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। এই সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে কোনো জনপ্রতিনিধির 'বিচার' দেওয়া আইনসম্মত নয়।ও তা যতই লোকালয়ভিত্তিক বা 'দ্রুত সমাধান' হিসেবে উপস্থাপিত হোক না কেন।

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের ক্ষমতা কোথায় সীমাবদ্ধ

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯- এই আইনেই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারিত। উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি, নাগরিক সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এসবই তাদের কাজ। কিন্তু কোথাও দেওয়ানি মামলা বিচার বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ড দেওয়ার ক্ষমতার কথা নেই। ফলে চেয়ারম্যান আদালত নন; তার সিদ্ধান্ত কোনো আদালতের রায়ও নয়।

তবে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে 'গ্রাম আদালত'কে কেন্দ্র করে। গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি বিশেষ আদালত গঠনের বিধান আছে।

এখানে চেয়ারম্যান সভাপতি হলেও তিনি একক বিচারক নন। উভয় পক্ষের মনোনীত প্রতিনিধি নিয়ে সমষ্টিগতভাবে আদালত চলে। এখতিয়ারও সীমিত-কিছু ছোট দেওয়ানি দাবি ও হালকা ফৌজদারি অপরাধ। কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা নেই; গুরুতর অপরাধ বিচারযোগ্য নয়। অর্থাৎ, গ্রাম আদালতের সীমিত এখতিয়ারকে ব্যক্তিগত 'চেয়ারম্যানি বিচার' বানিয়ে ফেলা আইন বিকৃতি।

ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের অবস্থান আরও স্পষ্ট

সিটি করপোরেশন আইন, ২০০৯ এবং পৌরসভা আইন, ২০০৯ দুটো আইনেই ওয়ার্ড কাউন্সিলরের বিচারিক ক্ষমতার কোনো উল্লেখ নেই। নাগরিক সমস্যা চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো, উন্নয়ন কাজ তদারকি- এগুলোই তাদের কাজ। দেওয়ানি বা ফৌজদারি বিচার তাদের এখতিয়ার নয়। অথচ কোথ কোথাও তারা 'সালিশ' বসিয়ে শাস্তি দিচ্ছেন- এটি আইনের বাইরে।

সালিশ, আপস আর বিচারড়গোলমালটা কোথায়

সালিশ বা মধ্যস্থতা বিচার নয়। সালিশ স্বেচ্ছামূলক; চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আর ফৌজদারি অপরাধে আপস করতে হলেও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী আদালতের অনুমোদন লাগে। জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত সালিশে মামলা ধামাচাপা দেওয়া বা জরিমানা আদায় আইনসম্মত নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা নিজেই অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

বিশেষ করে নারী ও দুর্বল পক্ষের ক্ষেত্রে এই 'বিচার' ভয়ংকর। যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা, যৌন হয়রানির মতো অপরাধকে সালিশে মীমাংসা করা আইনবিরুদ্ধ। এতে ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, অপরাধ উৎসাহ পায়।

কেন এই বেআইনি চর্চা টিকে আছে

একদিকে আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয়, অন্যদিকে আইনি অজ্ঞতা- এই দুইয়ে মিলে গ্রাম্য 'বিচার' জনপ্রিয় হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কিছু জনপ্রতিনিধির ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবণতা। কিন্তু দ্রুত সমাধানের অজুহাতে আইনের শাসনকে পাশ কাটানো কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্র যদি নিজেই বিচারবহির্ভূত শাস্তিকে প্রশ্রয় দেয়, তবে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়বে।

আইনের শাসনের স্বার্থে করণীয়

প্রথমত, গ্রাম আদালত ব্যবস্থাকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে- যাতে মানুষ বৈধ পথে দ্রুত সমাধান পায়। দ্বিতীয়ত, জনপ্রতিনিধিদের আইনি প্রশিক্ষণ জরুরি- কোথায় তাদের ক্ষমতা শেষ, তা স্পষ্ট জানা দরকার। তৃতীয়ত, বিচারবহির্ভূত জরিমানা ও শাস্তির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, নাগরিকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিচার মানেই আদালত; সালিশ মানেই বিচার নয়।

দেশের বর্তমান আইনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কিংবা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ব্যক্তিগতভাবে দেওয়ানি বা ফৌজদারি অপরাধের বিচার করার কোনো ক্ষমতা নেই। সীমিত পরিসরে গ্রাম আদালত আছে-কিন্তু তা আইননির্ধারিত কাঠামোর মধ্যেই। জনপ্রতিনিধি মানেই বিচারক-এই ভ্রান্ত ধারণা ভাঙতেই হবে।

আইনের শাসন বজায় রাখতে হলে বিচারকে বিচারালয়েই থাকতে দিতে হবে। নইলে 'দ্রুত বিচার'-এর নামে ন্যায়বিচারই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর