জেলে-কামার-কুমার : পেশার স্বীকৃতি, রাষ্ট্রের দায় ও বঞ্চিতদের অধিকার
সোমা কবীর
প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৯
দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে কিছু পেশা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জেলে, কামার ও কুমার- এই তিনটি পেশা কেবল জীবিকার উৎস নয়; এগুলো গ্রামবাংলার উৎপাদনব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। অথচ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এসব পেশাজীবী আজ প্রান্তিক, অবহেলিত ও বঞ্চিত। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে- জেলে, কামার, কুমারদের সরকারিভাবে পেশা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া যায় কি না? আর রাষ্ট্রের কাছে তাঁদের অধিকারই বা কী?
পেশার স্বীকৃতি: কেবল ঘোষণা নয়, সাংবিধানিক দায় : বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকের মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই প্রেক্ষাপটে জেলে, কামার ও কুমারদের পেশা হিসেবে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া কেবল নীতিগত বিষয় নয়; এটি সংবিধান প্রদত্ত রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব। বাস্তবে এসব পেশা যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় নথি, পরিকল্পনা ও বাজেট কাঠামোতে তারা অনেকাংশেই অনুপস্থিত। পেশাগত স্বীকৃতি না থাকায় তারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছ। আইনগতভাবে সরকার চাইলে কোনো পেশাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে পারে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা তা দেখেছি- ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, হস্তশিল্প, মৎস্যজীবী সম্প্রদায়, কারিগরি ও ভোকেশনাল পেশা।
জাতীয় শ্রমনীতি, শিল্পনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের আওতায় জেলে, কামার ও কুমারদের পেশাভিত্তিক শ্রেণি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা সম্পূর্ণভাবে সম্ভব। এর জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নীতিগত সদিচ্ছা।
জেলে সম্প্রদায়: নদীর সঙ্গে যাদের জীবন
জেলে সম্প্রদায় বাংলাদেশের মৎস্য খাতের মূল চালিকাশক্তি। দেশের প্রাণিজ আমিষের বড় অংশ আসে মাছ থেকে। অথচ নদীভাঙন, জলদস্যুতা, ইজারাদারদের দৌরাত্ম্য ও নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে জেলেরা চরম দুর্ভোগে পড়ে।
সরকারিভাবে পেশার স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তবে জেলেরা ন্যায্য সহায়তা পায় না, নিবন্ধন জটিলতায় ভোগে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত জেলে হয়েও তালিকার বাইরে থাকে। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
কামার ও কুমার: হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য
কামার ও কুমার এই দুই পেশা একসময় গ্রামীণ অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ ছিল। কৃষি যন্ত্রপাতি, রান্নার সামগ্রী, মাটির পাত্র—সবই আসত তাঁদের হাত ধরে। আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের চাপে এই পেশাগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে।
সরকারিভাবে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি না থাকায় তারা কোনো ভর্তুকি পায় না, প্রশিক্ষণ ও আধুনিকায়নের সুযোগ পায় না, ঋণ ও পুনঃঅর্থায়নে বঞ্চিত থাকে। ফলে একসময়ের দক্ষ কারিগররা পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য। বঞ্চিতদের অধিকার কী? জেলে, কামার ও কুমারদের অধিকারকে তিনটি স্তরে দেখা যায়-
এক. পেশাগত স্বীকৃতির অধিকার
রাষ্ট্রের কাছে তাঁদের প্রথম দাবি- পেশা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এটি ছাড়া অন্য কোনো অধিকার কার্যকর হয় না।
দুই. সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার
সংবিধানের আলোকে তারা ভাতা, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগকালীন সহায়তা, বার্ধক্য সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে।
তিন. অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার
পেশা টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, বাজারে প্রবেশাধিকার, ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশে বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেলেও ঐতিহ্যবাহী এই পেশাগুলো উপেক্ষিত। এটি কার্যত এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য। পেশার স্বীকৃতি না থাকায় তারা শ্রমিক হিসেবেও পূর্ণ মর্যাদা পায় না, উদ্যোক্তা হিসেবেও নয়। এই অবস্থা সংবিধানের সমতার নীতির পরিপন্থী। এখন সময় এসেছে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সরকার চাইলে জেলে, কামার ও কুমারদের সরকারিভাবে স্বীকৃত পেশা ঘোষণা করতে পারে, আলাদা পেশাভিত্তিক ডাটাবেস তৈরি করতে পারে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিশেষ কোটা দিতে পারে, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে পেশাগুলোকে টেকসই করতে পারে। এটি দয়া নয়; এটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। জেলে, কামার ও কুমাররা কেবল কিছু পেশাজীবী গোষ্ঠী নয়। তারা বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির নীরব কারিগর। তাঁদের বঞ্চনা রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। সরকারিভাবে পেশা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া সম্পূর্ণভাবে সম্ভব এবং আইনগতভাবে বৈধ। প্রশ্ন একটাই রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত? একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের পরিচয় কেবল বড় প্রকল্পে নয়; বরং প্রান্তিক পেশাজীবীদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যেই প্রকৃত উন্নয়ন নিহিত। এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার পালা।
বিকেপি/এমবি

