Logo

আইন ও বিচার

নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা : রাজনৈতিক অসৌজন্য নাকি গুরুতর অপরাধ?

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৮

নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা : রাজনৈতিক অসৌজন্য নাকি গুরুতর অপরাধ?

জাতীয় নির্বাচন কোনো দলের একক রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের উপলক্ষ নয়; এটি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। অথচ প্রতি নির্বাচনের সময়ই আমরা দেখি- প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের গালিগালাজ, শারীরিক হুমকি, এমনকি পচা ডিম, জুতা বা বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা। এ ধরনের আচরণ কি কেবল রাজনৈতিক অসৌজন্য, নাকি আইনের দৃষ্টিতে এটি গুরুতর অপরাধ? একই সঙ্গে জানতে হবে, জাতীয় নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিনষ্টকারীদের জন্য আইন কী শান্তির বিধান রেখেছে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৭ ও ৩৮ অনুচ্ছেদ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করেছে। নির্বাচনী প্রচারণা এই মৌলিক অধিকারেরই বাস্তব প্রকাশ। কিন্তু এই অধিকার অসীম নয়। সংবিধান নিজেই জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও অন্যের অধিকারের স্বার্থে যুক্তিসংগত সীমাবদ্ধতার কথা বলেছে।

অতএব, নির্বাচনী প্রচারণার সময় কাউকে গালিগালাজ করা, অপমানজনক স্লোগান দেওয়া বা বস্তু ছুড়ে মারার মতো আচরণ সাংবিধানিক অধিকারের পরিধির মধ্যে পড়ে না; বরং এটি আইনের লঙ্ঘন।

গালিগালাজ: শুধু অসভ্যতা নয়, অপরাধ। নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থী বা তার কর্মীদের উদ্দেশে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার ও গালিগালাজ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী একাধিক অপরাধের উপাদান বহন করে। ধারা ৫০৪ (ইচ্ছাকৃত অপমান): ইচ্ছাকৃ তভাবে কাউকে অপমান করে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা সৃষ্টি করলে তা অপরাধ।

ধারা ৫০৬ (ফৌজদারি ভীতি প্রদর্শন): হুমকি বা ভয় দেখানো হলে তা শাস্তিযোগ্য। এ ধরনের আচরণ নির্বাচনী উত্তেজনাকে সহিংসতায় রূপ দিতে পারে যা আইনের চোখে গুরুতর।

পচা ডিম ছোড়া: প্রতীকী প্রতিবাদ না, শারীরিক আক্রমণ:

অনেকে মনে করেন, পচা ডিম বা হালকা বস্তু ছুড়ে মারা "প্রতীকী প্রতিবাদ"। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে এটি মোটেও তুচ্ছ বিষয় নয়।

ধারা ৩৫২ (বলপ্রয়োগ বা হামলা) অনুযায়ী কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে বস্তু নিক্ষেপ করাও অপরাধ। আঘাত গুরুতর হলে ধারা ৩২৩ বা ৩২৫ পর্যন্ত প্রযোজ্য হতে পারে।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় এ ধরনের হামলা কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ওপর আঘাত নয়; এটি ভোটের পরিবেশকে আতঙ্কিত করে তোলে। 

নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা ও আচরণবিধি জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন প্রণীত আচরণবিধি স্পষ্টভাবে বলে-

কোনো প্রার্থী বা তার কর্মীরা প্রতিপক্ষের সভা-সমাবেশে বাধা দিতে পারবেন না; ভীতি প্রদর্শন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা অপমানজনক আচরণ নিষিদ্ধ। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ফলে প্রার্থীর বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা, জরিমানা, এমনকি প্রার্থিতা বাতিলের সুপারিশও আসতে পারে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) ও নির্বাচনী অপরাধ 

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী নির্বাচন চলাকালে বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন, ভোটার বা প্রার্থীকে বাধাগ্রস্ত করা সবই নির্বাচনী অপরাধ। এসব অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

গালিগালাজ বা হামলার মাধ্যমে যদি কোনো প্রার্থী বা ভোটারকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়, তবে তা সরাসরি নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। 

গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিনষ্ট: শুধু ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্রবিরোধী আচরণ 

নির্বাচনী সহিংসতা কোনো একক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে আঘাত। নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হলে ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে ভয় পান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই কারণে আইন গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিনষ্টকারীদের প্রতি শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছে।

 শান্তির পরিধি: কী হতে পারে পরিণতি

আইন অনুযায়ী এমন অপরাধে দণ্ডবিধি অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড, নির্বাচনী আইনে অতিরিক্ত শাস্তি, প্রার্থিতা বাতিল বা নির্বাচন পরবর্তী মামলা সবকিছুই সম্ভব। অপরাধ যত সংঘবদ্ধ ও সহিংস হবে, শাস্তিও তত কঠোর হবে। আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল হলে সহিংসতা বাড়ে। নির্বাচনী মাঠে গালিগালাজ ও হামলা প্রমাণ করে- আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতার ঘাটতি রয়েছে। মতের অমিল গণতন্ত্রের প্রাণ; কিন্তু সেই অমিলকে শত্রুতায় রূপ দেওয়াই গণতন্ত্রের মৃত্যু।

রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজ নিজ কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা: নির্বাচন কমিশনের উচিত তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন প্রয়োগ করা; নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের উচিত এসব ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় গালিগালাজ বা পচা ডিম ছুড়ে মারা কোনো রাজনৈতিক কৌশল নয়; এটি সুস্পষ্টভাবে আইন লঙ্ঘন ও নির্বাচনী অপরাধ। জাতীয় নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিনষ্টকারীরা কেবল প্রতিপক্ষের শত্রু নয়- তারা জনগণের ভোটাধিকার ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তির শত্রু। গণতন্ত্র টিকে থাকে সহনশীলতা ও আইনের শাসনে। নির্বাচনী মাঠে যদি আইন নীরব থাকে, তবে বিজয়ী হয় সহিংসতা আর পরাজিত হয় জনগণ। তাই এখন সময় এসেছে, গণতন্ত্রের নামে অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করার।

বিকেপি/এমবি

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত সংসদ নির্বাচন

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর