মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি আটক হলে শাস্তি বৃদ্ধি
কে এম অ্যাডভোকেট খায়রুল কবীর
প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১১
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আদালতের রায় কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সেই রায় কার্যকর হওয়াই ন্যায়বিচারের প্রকৃত সার্থকতা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়- মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তি ঘোষণার পরও কোনো কোনো আসামি দীর্ঘদিন ফেরারি থেকে যায়। এতে জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামি যদি দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর আটক হয়, তাহলে কি তার শাস্তি আরও বাড়ে? নাকি আইন তাকে একই দণ্ডেই সীমাবদ্ধ রাখে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগ নয়, আমাদের ফিরে যেতে হবে সংবিধান, দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মৌলিক দর্শনের দিকে।
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ অনুযায়ী, আদালতের আদেশ অমান্য করে যে ব্যক্তি আত্মগোপন করে বা গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলে, তাকেই সাধারণভাবে ফেরারি আসামি বলা হয়। আদালত এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন এবং প্রয়োজনে তাকে পলাতক ঘোষণা করে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিতে পারেন। এ ব্যবস্থা আদালতের ক্ষমতা ও আদেশের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার জন্য প্রণীত। তবে মনে রাখতে হবে, ফেরারি থাকা নিজেই স্বতন্ত্র কোনো অপরাধ নয়, যদি না আইন বিশেষভাবে তা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র পালিয়ে থাকার কারণে আসামির বিরুদ্ধে নতুন কোনো শাস্তি আরোপের সুযোগ আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেয় না।
মৃত্যুদণ্ড: সর্বোচ্চ শাস্তির সীমারেখা : বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এ মৃত্যুদণ্ডকে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড সব শাস্তির ঊর্ধ্বে অবস্থান করে মৃত্যুদণ্ড। ফলে আইনের দৃষ্টিতে একটি মৌলিক সত্য হলো মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে কঠোর কোনো শাস্তি নেই। এই বাস্তবতার কারণে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামির শাস্তি “বৃদ্ধি” করার প্রশ্নই আইনগতভাবে অবান্তর। আদালত একবার মৃত্যুদণ্ড দিলে, তার ওপরে আর কোনো অতিরিক্ত দণ্ড আরোপের সুযোগ নেই। ফেরারি থাকার কারণে সেই দণ্ড দ্বিগুণ করা বা অন্য কোনো কঠোরতর শাস্তি যোগ করার বিধান বাংলাদেশের কোনো আইনে নেই। অনেকের ধারণা, রায় ঘোষণার পর পালিয়ে যাওয়া মানেই নতুন অপরাধ। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। যদি কোনো আসামি বিচারাধীন অবস্থায় বা রায় ঘোষণার পর আত্মগোপন করে, তা মূলত আদালতের আদেশ অমান্যের একটি আচরণ, কিন্তু এটি নিজে নিজে নতুন কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। তবে ব্যতিক্রম তখনই ঘটতে পারে, যখন পালানোর সময় সে পুলিশ বা কারা কর্তৃপক্ষের ওপর হামলা চালায়; সরকারি কাজে বাধা দেয়; জেল হেফাজত থেকে পালিয়ে যায়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় নতুন ও পৃথক মামলা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন অপরাধের জন্য পৃথক শাস্তি প্রদান করা সম্ভব, কিন্তু তাতেও মূল মৃত্যুদণ্ডের রায় অপরিবর্তিতই থাকে।
ফেরারি থাকার কারণে দণ্ড কার্যকর বিলম্ব : মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার আগে কিছু সাংবিধানিক ও আইনগত ধাপ অতিক্রম করতে হয়, হাইকোর্ট ডিভিশনে ডেথ রেফারেন্স অনুমোদন, আপিল ও রিভিউ নিষ্পত্তি এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ। আসামি ফেরারি হলে এই পুরো প্রক্রিয়াই কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়- ফেরারি থাকার ফলে শাস্তি বাড়ে না, কিন্তু ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়। এই বিলম্ব রাষ্ট্রের জন্য যেমন বিব্রতকর, তেমনি ভুক্তভোগী পরিবার ও সমাজের জন্যও হতাশাজনক।
রাষ্ট্রপতির প্রাণভিক্ষা ও ফেরারি থাকার প্রভাব : বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা লঘু করার ক্ষমতা রাখেন। এটি একটি সাংবিধানিক ক্ষমা, যা আইনের কঠোরতার বাইরে মানবিক বিবেচনায় প্রয়োগ করা হয়। আইনে স্পষ্টভাবে বলা নেই যে ফেরারি থাকলে প্রাণভিক্ষা পাওয়া যাবে না। তবে বাস্তবে দীর্ঘদিন পলাতক থাকা, বিচারিক আদেশের প্রতি অবজ্ঞা, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য করা, এসব বিষয় প্রাণভিক্ষা বিবেচনায় আসামির বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এটিকে শাস্তি বৃদ্ধি বলা যাবে না; বরং এটি ক্ষমা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও নৈতিক মূল্যায়নের অংশ।
দ্বৈত দণ্ড নিষেধাজ্ঞা ও মানবাধিকার : আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে “ডাবল জিওপার্ডি” বা একই অপরাধে একাধিক শাস্তি প্রদান নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানও এই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ফেরারি থাকার কারণে অতিরিক্ত শাস্তি দিলে তা এই মৌলিক নীতির পরিপন্থী হবে। আইনের উদ্দেশ্য শাস্তির সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং শাস্তির ন্যায়সংগত ও নিশ্চিত প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
সামাজিক বাস্তবতা ও রাষ্ট্রের দায় : আইনের চোখে শাস্তি না বাড়লেও, সামাজিকভাবে ফেরারি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বিচারব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। এতে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে-রাষ্ট্র কি সত্যিই তার সর্বোচ্চ রায় কার্যকর করতে সক্ষম? এই প্রশ্নের জবাব শাস্তি বাড়িয়ে নয়, বরং- দক্ষ তদন্ত, কার্যকর অনুসন্ধান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ফেরারি আসামিকে দ্রুত আটক করার মধ্যেই নিহিত।
স্পষ্টভাবে দেখা যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি আটক হলে তার মূল শাস্তি আইনগতভাবে বৃদ্ধি পায় না; মৃত্যুদণ্ডই সর্বোচ্চ দণ্ড, এর ঊর্ধ্বে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই; ফেরারি অবস্থায় নতুন অপরাধ করলে পৃথক মামলায় আলাদা শাস্তি হতে পারে; ফেরারি থাকার বিষয়টি প্রাণভিক্ষা বিবেচনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আইনের শক্তি শাস্তির কঠোরতায় নয়, বরং শাস্তির নিশ্চিত বাস্তবায়নে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি যতদিন ফেরারি থাকে, ততদিন রাষ্ট্রের বিচারিক কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই প্রয়োজন শাস্তি বাড়ানোর বিতর্ক নয়, বরং বিলম্বিত ন্যায়বিচার যেন আর বিলম্বিত না হয়- সে বিষয়ে রাষ্ট্রের দৃঢ় অঙ্গীকার।
বিকেপি/এমবি

