Logo

আইন ও বিচার

ন্যায়বিচার নিশ্চিতের স্বার্থে :

আদালতে পেন্সিলের ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি

Icon

মাসুম আহমেদ

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:১১

আদালতে পেন্সিলের ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি

ন্যায়বিচার একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা যত দৃঢ় হয়, রাষ্ট্র তত বেশি সুসংহত হয়। কিন্তু সেই বিচারব্যবস্থার দৈনন্দিন প্রশাসনিক দুর্বলতা যদি বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে ন্যায়বিচারের মূল চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বহুল প্রচলিত একটি নীরব কিন্তু মারাত্মক সমস্যা হলো আদালতের নথি, কার্যতালিকা ও মামলার ধার্য তারিখ লেখার ক্ষেত্রে পেন্সিলের ব্যবহার। এই আপাতদৃষ্টিতে সামান্য বিষয়টি বাস্তবে বহু বিচারপ্রার্থীর জন্য বড় ধরনের হয়রানি, আর কখনো কখনো গুরুতর অবিচারের কারণ হয়ে উঠছে।

পেন্সিলের ব্যবহার: একটি নীরব অনিয়ম :

দেশের অধিকাংশ নিম্ন আদালতে এখনো দেখা যায়, মামলার আদেশপত্র, কার্যতালিকা, রেজিস্টার কিংবা মামলার ধার্য তারিখ পেন্সিল দিয়ে লেখা হচ্ছে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়- তারিখ পরিবর্তন হতে পারে, সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সুযোগের অপব্যবহার হচ্ছে অহরহ। পেন্সিল দিয়ে লেখা তথ্য খুব সহজেই রাবার দিয়ে মুছে ফেলা যায়, কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ না রেখেই পরিবর্তন করা যায়। ফলে মামলার ধার্য তারিখ বদলে যাওয়া, নাম কাটা বা যুক্ত হওয়া, এমনকি আদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিকৃত হওয়ার ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়।

মামলার তারিখ নিয়ে ভোগান্তি: বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ : 

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা মামলার ধার্য তারিখ নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট তারিখ আদালতে হাজির হওয়ার জন্য বিচারপ্রার্থী বহু দূর থেকে এসে জানতে পারেন, মামলার তারিখ বদলে গেছে। কখনো বলা হয়, “তারিখ তো আগেই পরিবর্তন করা হয়েছে”, আবার কখনো বলা হয়, “রাবার দিয়ে মুছে নতুন তারিখ লেখা হয়েছে।” কিন্তু এই পরিবর্তনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি।

এর ফলে বিচারপ্রার্থীদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, সময় নষ্ট হয়, মানসিক চাপ বাড়ে। গ্রাম থেকে শহরে এসে আদালতে হাজির হওয়া মানে শুধু একটি দিন নষ্ট হওয়া নয়, কৃষক তার ক্ষেত ছেড়ে আসে, শ্রমিক তার মজুরি হারায়, অসুস্থ মানুষ কষ্ট নিয়ে আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। এসব ভোগান্তি বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষয় করে।

পেন্সিল ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো এটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিপন্থী। কালিতে লেখা কোনো নথি পরিবর্তন করতে গেলে সংশোধনের চিহ্ন থাকে, তারিখ থাকে, স্বাক্ষর লাগে। কিন্তু পেন্সিলের ক্ষেত্রে এসবের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। ফলে কে কখন কী পরিবর্তন করল তার কোনো হিসাব থাকে না।

এই পরিস্থিতি অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অনৈতিক সুবিধার দরজা খুলে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ বা তদবিরের বিনিময়ে মামলার তারিখ এগিয়ে বা পেছানো হয়, ফাইল ‘গায়েব’ করা হয়, অথবা কার্যতালিকায় নাম ওঠানামা করানো হয়। যদিও এসব অভিযোগ সব ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয় না, তবুও এমন অভিযোগের অস্তিত্বই বিচারব্যবস্থার ভাবমূর্তির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

আইনের একটি বহুল উদ্ধৃত নীতি হলো- Justice delayed is justice denied। পেন্সিলের অবাধ ব্যবহার সেই বিলম্বকে আরও দীর্ঘ করে তোলে। মামলার তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি, হাজিরা না দেওয়ার অভিযোগ, এসবের পেছনে অনেক সময় এই পেন্সিল-নির্ভর প্রশাসনিক দুর্বলতা কাজ করে।

একটি মামলায় যদি বারবার তারিখ পরিবর্তন হয় এবং পক্ষগুলো সময়মতো অবগত না হয়, তবে মামলার নিষ্পত্তি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এতে শুধু বিচারপ্রার্থীর ক্ষতি হয় না; আদালতের মামলার জটও বাড়তে থাকে।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে বিচার বিভাগের ডিজিটালাইজেশন নিয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে- ই-জুডিশিয়ারি, অনলাইন কজলিস্ট, ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ। সেই প্রেক্ষাপটে আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নথিতে পেন্সিল ব্যবহার এক ধরনের প্রশাসনিক পশ্চাৎপদতা ছাড়া আর কিছু নয়।

যেখানে ব্যাংক, ভূমি অফিস, এমনকি স্কুল-কলেজেও স্থায়ী রেকর্ড কালি বা ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়, সেখানে আদালতের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে পেন্সিল ব্যবহার যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না।

আইনগত দৃষ্টিভঙ্গি ও নথির বিশ্বাসযোগ্যতা

আইনগতভাবে আদালতের নথি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আদেশপত্র, কার্যবিবরণী, রেজিস্টার এসবের ওপর ভিত্তি করেই উচ্চ আদালতে আপিল, রিভিশন বা রেফারেন্স দাখিল হয়। যদি এই নথিগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে পুরো বিচারপ্রক্রিয়াই দুর্বল হয়ে পড়ে।

পেন্সিল দিয়ে লেখা ও মুছে ফেলা নথি ভবিষ্যতে প্রমাণ হিসেবে কতটা গ্রহণযোগ্য- সে প্রশ্নও থেকে যায়। এতে আইনের শাসনের ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই সমস্যা সমাধানে কিছু বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের একাধিক সিনিয়র আইনজীবী।  প্রথমত, আদালতের সব আনুষ্ঠানিক নথিতে পেন্সিলের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। শুধু কালো বা নীল কালির কলম ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোনো সংশোধন প্রয়োজন হলে তা কাটাকাটি না করে সংশোধনী নোট দিয়ে, তারিখ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরসহ করতে হবে। তৃতীয়ত, মামলার ধার্য তারিখ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে লিখিত বা ডিজিটাল নোটিশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। চতুর্থত, আদালতের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও আচরণবিধি জোরদার করতে হবে, যাতে তারা নথির গুরুত্ব ও স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। পঞ্চমত, ধীরে ধীরে হলেও সব আদালতে ডিজিটাল রেকর্ড ও কজলিস্ট ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে ইচ্ছামতো পরিবর্তনের সুযোগ কমে আসে।

বিচার বিভাগের প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে বিষয়টি বিবেচনা জরুরি

এটি কোনো তুচ্ছ বা খুঁটিনাটি সমস্যা নয়। আদালতে পেন্সিলের ব্যবহার বন্ধ করা মূলত বিচার বিভাগের প্রশাসনিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ন্যায়বিচার শুধু সঠিক রায় দিলেই হয় না; ন্যায়বিচার হতে হবে দৃশ্যমান, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য।

একজন বিচারপ্রার্থী যেন আদালতে এসে অনিশ্চয়তা, সন্দেহ ও হয়রানির শিকার না হন, এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পেন্সিলের মতো একটি ছোট উপকরণ যদি সেই আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে, তবে তা বাদ দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

আদালত কোনো সাধারণ দপ্তর নয়; এটি মানুষের শেষ ভরসাস্থল। সেখানে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি তারিখ, প্রতিটি নথির প্রতি মানুষের আস্থা জড়িত। সেই আস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে এমন কোনো চর্চা চলতে পারে না। তাই সময় এসেছে- আদালতে পেন্সিলের ব্যবহার বন্ধ করে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক বিচার প্রশাসনের পথে এগিয়ে যাওয়ার।

ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতেই হবে। আর সেই শৃঙ্খলার শুরু হোক, একটি কলমের রঙ থেকে। 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর