Logo

আইন ও বিচার

‘গায়ে মানে না আপনি মোড়ল’:

গ্রামে স্বঘোষিত সালিশ আর ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শন

Icon

রুদ্র পারভেজ

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:২০

গ্রামে স্বঘোষিত সালিশ আর ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শন

বাংলা সমাজে প্রচলিত একটি প্রবাদ- ‘গায়ে মানে না আপনি মোড়ল’- আজকের গ্রামীণ বাস্তবতায় যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যার গায়ে কোনো বৈধতা নেই, সামাজিক স্বীকৃতি নেই, নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নেই, তিনিই আজ গ্রামের মোড়ল, বিচারক, সালিশদার ও ফয়সালাকার। গ্রামবাংলার চিরাচরিত শান্তিপূর্ণ সামাজিক কাঠামো আজ ভেঙে পড়ছে স্বঘোষিত সালিশ, দালাল ও ক্ষমতালোভী তথাকথিত নেতাদের দৌরাত্ম্যে।

এক সময় গ্রাম ছিল পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায়বোধের প্রতীক। বয়োজ্যেষ্ঠ, অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য মানুষদের নেতৃত্বে গ্রামের বিরোধ মিটত। সেই সালিশ ছিল অনানুষ্ঠানিক হলেও ন্যায়নিষ্ঠ, মানবিক এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু আজ সেই সালিশ ব্যবস্থার নাম ভাঙিয়ে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর অনৈতিক চক্র যেখানে ন্যায় নয়, চলে শক্তি; সত্য নয়, চলে প্রভাব; আর বিচার নয়, চলে দরকষাকষি।

সালিশের নামে ক্ষমতার প্রদর্শনী : 

বর্তমানে গ্রামের অনেক সালিশ বসে কোনো সামাজিক প্রয়োজনে নয়, বরং ক্ষমতা জাহিরের মঞ্চ হিসেবে। সালিশদারদের অনেকেই নিজেরাই ঘোষণা দেন- “আমার কথা শেষ কথা”, “আমার সালিশ মানতেই হবে।” অথচ তাদের এই ‘মোড়লত্বের’ পেছনে নেই কোনো আইনগত ভিত্তি, নেই কোনো সামাজিক সম্মতি। এটাই সেই ‘গায়ে মানে না আপনি মোড়ল’ বাস্তবতা।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গ্রামের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা দালাল নিজের ইচ্ছেমতো সালিশ বসান। সেখানে দুর্বল পক্ষকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয় না। রায় আগেই ঠিক থাকে—কে জিতবে, কে হারবে। সালিশ তখন আর ন্যায়বিচারের মাধ্যম থাকে না, হয়ে ওঠে জুলুমের হাতিয়ার।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো গ্রামের সালিশ ব্যবস্থায় দালালদের সক্রিয় অনুপ্রবেশ। তারা সালিশকে পরিণত করেছে এক ধরনের অবৈধ ব্যবসায়। জমি সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, এমনকি ফৌজদারি অপরাধও এখন ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা চলে গ্রাম্য সালিশে।

এই দালালরা প্রথমে দুই পক্ষের কাছে যান, পরিস্থিতি ঘোলাটে করেন, ভয় দেখান- “কোর্টে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।” এরপর নিজেরাই সালিশ বসিয়ে অর্থের বিনিময়ে একপক্ষকে সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এতে করে আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়, আর অপরাধীরা উৎসাহিত হয়।

গ্রাম্য সালিশের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি প্রকাশ পায় নারী ও দুর্বল মানুষের ক্ষেত্রে। অনেক সময় পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক নির্যাতন বা ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধও সালিশে ‘মিটিয়ে ফেলা’ হয়। সালিশের নামে নারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়, মেনে নিতে বলা হয় অবিচার, চুপ থাকতে বলা হয় লজ্জার ভয়ে। এ ধরনের সালিশ শুধু আইনবিরোধী নয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

আইনকে পাশ কাটিয়ে ‘বিচার’ দেওয়ার প্রবণতা

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ফৌজদারি অপরাধের বিচার কেবল আদালতেই হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক গ্রাম্য সালিশে মারধর, চুরি, এমনকি হত্যাচেষ্টার মতো ঘটনাও ‘সমাধান’ করে ফেলা হয়। এর মাধ্যমে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, আর ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।

এটি সরাসরি আইনের শাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। যখন মানুষ আইনের বদলে স্বঘোষিত মোড়লের শরণাপন্ন হয়, তখন রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে।

আজকের গ্রামের অনেক সালিশদার বা দালালের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয় বা আশ্রয়। কোনো দলের নাম ব্যবহার করে তারা নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করে। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। কেউ মুখ খুললেই হুমকি, সামাজিক বয়কট বা মিথ্যা মামলার ভয় দেখানো হয়।

এই রাজনৈতিক প্রশ্রয়ই ‘গায়ে মানে না আপনি মোড়ল’ মানসিকতাকে আরও উসকে দিচ্ছে।

সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক সংকট

গ্রাম্য সালিশের এই বিকৃত রূপ সমাজে গভীর নৈতিক সংকট তৈরি করছে। তরুণ প্রজন্ম শিখছে- ক্ষমতা থাকলে আইন মানতে হয় না, জোর থাকলে ন্যায়ের দরকার নেই। এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য ভয়ংকর বার্তা।

একসময় গ্রাম ছিল নৈতিক শিক্ষার আঁতুড়ঘর। আজ সেই গ্রামেই অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে সালিশের নামে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ আলী। তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন,  গ্রাম্য সালিশের নামে আইনবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধ সালিশ বসানোকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তাদের নীরবতা অনেক সময় দালালদের সাহস জোগায়। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষকে আইনি সচেতনতা দিতে হবে—কোন বিষয় সালিশে হতে পারে, আর কোন বিষয় আদালতের এখতিয়ার। চতুর্থত, প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য ও মানবিক সামাজিক মধ্যস্থতার জন্য আইনসম্মত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (অউজ) ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।

‘গায়ে মানে না আপনি মোড়ল’- এই প্রবাদটি আজ শুধু কথার কথা নয়, গ্রামীণ সমাজের করুণ বাস্তবতা। স্বঘোষিত মোড়ল, সালিশের নামে দালাল আর ক্ষমতার অপব্যবহার যদি থামানো না যায়, তবে গ্রাম শুধু আইনহীন নয়, ন্যায়হীন জনপদে পরিণত হবে।

ন্যায়বিচার কোনো ব্যক্তির দয়া নয়, এটি মানুষের অধিকার। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার কোনো স্বঘোষিত মোড়লের নেই। এখনই সময়-সালিশের নামে স্বেচ্ছাচার বন্ধ করে গ্রামে গ্রামে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার। নইলে একদিন এই মোড়লতন্ত্রই গ্রাস করবে সমাজের শেষ নৈতিক ভিত্তিটুকু। 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর